খুলনায় প্রায় দুই দশক ধরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে খুলনা নিউজপ্রিন্টসহ বন্ধ তিন কারখানার জমি। এসব জমিতে নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি কয়েক বছরেও। ফলে এসব কারখানার চাকরি হারানো শ্রমিকরা অনিশ্চয়তা ও হতাশায় দিন পার করছেন।
১৯৫৭ সালে খুলনার খালিশপুরে ভৈরব নদের তীরে যাত্রা শুরু হয়েছিল খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের। লোকসানের কারণে ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর কারখানাটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পাশেই ১৯৬৫ সালে স্থাপিত খুলনা হার্ডবোর্ড মিলটি বন্ধ করে দেয়া হয় ২০১৩ সালের ২৬ নভেম্বর। ১৯৫৫ সালে নগরের রূপসা এলাকায় স্থাপিত দাদা ম্যাচ কারখানাও বন্ধ এক যুগ ধরে।
বন্ধ এ তিন কারখানার জমিতে বিভিন্ন সময় নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেয় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। কাগজকল, সার কারখানা ও এসিড কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানানো হলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের মোট জমির পরিমাণ ৮৭ দশমিক ৬১ একর। এর মধ্যে ৩৭ একর জমিতে মূল কারখানা অবস্থিত। বাকি ৫০ একর জায়গায় কর্মকর্তাদের আবাসিক এলাকা, কর্মচারী ও শ্রমিকদের কোয়ার্টার, হাসপাতালসহ অন্যান্য স্থাপনা ছিল। নিউজপ্রিন্ট কারখানার পাশেই খুলনা হার্ডবোর্ড মিল। বন্ধ এ কারখানার জমির পরিমাণ ৯ দশমিক ৯৬ একর। সেই জমিটিও দীর্ঘদিন পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়।
বিসিআইসি ও নিউজপ্রিন্ট মিল কর্তৃপক্ষ জানায়, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালুর জন্য কারখানাটি ২০০৫ সালে প্রাইভেটাইজেশন কমিশনে তালিকাভুক্ত হয়। এরপর কারখানাটি বিক্রির জন্য দুই দফা দরপত্র আহ্বান করা হলেও সাড়া মেলেনি। এমন অবস্থায় ২০০৯ সালে কারখানাটির জমিতে বিকল্প শিল্প-কারখানা স্থাপনের জন্য কারিগরি সমীক্ষা চালায় বিসিআইসি। এতে বলা হয়, ৪২২ কোটি টাকা ব্যয়ে কারখানাটির জমিতে নতুন কাগজকল স্থাপন করা যেতে পারে। পরে সেই পরিকল্পনা আর আলোর মুখ দেখেনি।
২০১৪ সালে ফের কারখানাটির জমিতে নতুন তিনটি কাগজকল নির্মাণের প্রস্তাব আসে।
২০১৮ সালে অর্থসংস্থানের জন্য কারখানাটির মূল অংশ বাদে বাকি ৫০ একর জমি নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির (এনডব্লিউপিসিএল) কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। কথা ছিল, সেই টাকা দিয়ে কাগজকল হবে। কিন্তু জমি বিক্রির পর সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে বিসিআইসি। বলা হয়, যেহেতু কর্ণফুলী পেপার মিলসহ দেশের অন্য কাগজকলগুলোর অবস্থা ভালো নয়, তাই খুলনায় আরেকটি কাগজকল হলে তা লাভজনক হবে না।
২০১৯ সালের ৭ ডিসেম্বর বন্ধ কারখানাটি পরিদর্শনে এসে এ জমিতে একটি টিএসপি সার কারখানা নির্মাণের কথা জানান শিল্প প্রতিমন্ত্রী। কিন্তু পরের বছরই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, নৌপথে সার তৈরির কাঁচামাল আনার মতো নাব্য ভৈরব নদে নেই।
২০২১ সালের জানুয়ারিতে কারখানার জমিতে কার্বন, এসিড ও কাগজকল নির্মাণের নতুন পরিকল্পনা নেয়া হয়। সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি। সর্বশেষ ২০২২ সালে নিউজপ্রিন্ট ও হার্ডবোর্ড মিলের ৪৭ দশমিক ৬১ একর জমিতে কী ধরনের কারখানা স্থাপনা করা যেতে পারে, তা নিয়ে নতুন আরেকটি সমীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। চলতি বছরের ১৩ জুলাই সেই সমীক্ষার খসড়া জমা পড়েছে। সেখানে ওষুধ তৈরির কাঁচামাল, কাগজকল অথবা অন্য একটি কারখানা স্থাপন করা যেতে পারে বলে মতামত দেয়া হয়েছে।
নিউজপ্রিন্ট ও হার্ডবোর্ড মিলের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সাঈদ বলেন, ‘আমরা চেয়ারম্যানকে হাইলাইটস নামে একটি পাওয়ার প্রেজেন্টেশন দেখাব। সেখানে এ জায়গার রেশিও অ্যানালাইসিস, ফিজিবিলিটি, সম্ভাবনা ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য উপস্থাপন করা হবে।’
অন্যদিকে বন্ধ ঘোষণার এক যুগের বেশি সময় পরও চালু হয়নি খুলনার দাদা ম্যাচ কারখানা। খুলনা নগরের রূপসা এলাকায় রূপসা নদীর তীরে ১৯৫৫ সালে ১৭ দশমিক ৭৯ একর জায়গার ওপর বেসরকারি উদ্যোগে কারখানাটি চালু হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কারখানাটি জাতীয়করণ করা হয়। পরিচালনার দায়িত্ব পায় বিসিআইসি। ১৯৮৪ সালে বিরাষ্ট্রীয়করণ নীতির আওতায় ঢাকা ম্যাচ ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানি লিমিটেড গঠন করা হয়। এ কোম্পানির অধীনে দেয়া হয় কারখানাটি। কোম্পানিটির ৩০ শতাংশ মালিকানা বিসিআইসির হাতে রেখে ৭০ শতাংশ বিক্রি করা হয় সুইডেনের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে। ১৯৮৯ সালে সুইডেন কোম্পানি কারখানা দুটিতে তাদের মালিকানার অংশ বিক্রি করে দেয়। এরপর তা কিনে নেয় ভাইয়া গ্রুপ। তারা ১৯৯৩ সালে আবার কারখানা দুটি চালু করলেও ২০০৫ সালে ঢাকা ম্যাচ ও ২০১০ সালে টারমিনেশন পদ্ধতিতে দাদা ম্যাচ বন্ধ করে দেয়। শিল্প মন্ত্রণালয় ২০১১ সালে কারখানা দুটি সিলগালা করে দাদা ম্যাচের দেখভালের দায়িত্ব দেয় জেলা প্রশাসনকে। আর ঢাকা ম্যাচ কারখানার নিয়ন্ত্রণ এখনো কোম্পানির কাছেই রয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুটি কারখানার কয়েক হাজার শ্রমিক চাকরি হারান।
খুলনার নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট কুদরত-এ খুদা বলেন, ‘এতদিন কারখানটি বন্ধ রাখা একেবারেই অযৌক্তিক। এভাবে ফেলে না রেখে এ বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। ওই কারখানার জায়গায় কোন শিল্প করলে লাভজনক হবে, তা নির্ধারণে সম্ভাব্যতা যাচাই দরকার। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে সরকারি উদ্যোগ নেই বললেই চলে।’










