তীব্র গরম, খরা ও বন্যায় চলতি বছরের গ্রীষ্মে ইউরোপে স্বল্পমেয়াদি আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৪৩ বিলিয়ন ইউরো (বাংলাদেশী মুদ্রায় ৬ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি) ছাড়িয়েছে বলে এক প্রাথমিক হিসাবে উঠে এসেছে। এর দীর্ঘমেয়াদি হিসাবে ২০২৯ সালের মধ্যে এ ক্ষতির মাত্রা ১২৬ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ১৮ লাখ কোটি টাকার সমান)। গত গ্রীষ্মে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে জার্মানির গ্যেটে ইউনিভার্সিটি ফ্রাঙ্কফুর্ট ও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) অর্থনীতিবিদদের চালানো এক অ্যাকাডেমিক সমীক্ষার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
‘গোয়িং নাটস: দ্য রিজিওনাল ইমপ্যাক্ট অব এক্সট্রিম ক্লাইমেট ইভেন্টস ওভার দ্য মিডিয়াম টার্ম’ শিরোনামে ওই সমীক্ষার ফলাফল ইউরোপিয়ান ইকোনোমিক রিভিউতে চলতি সেপ্টেম্বরেই প্রকাশ হয়েছে। সমীক্ষা প্রতিবেদনটি এখনো যথাযথ পিয়ার-রিভিউয়ের মধ্য দিয়ে যায়নি, তবে এটি চলতি মাসেই প্রকাশিত আরেকটি একাডেমিক গবেষণায় ব্যবহৃত আবহাওয়া ও অর্থনৈতিক তথ্যের সম্পর্কের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
তবে গবেষকরা তাদের সমীক্ষার ফলাফলকে “রক্ষণশীল” বলে দাবি করছেন। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, দক্ষিণ ইউরোপে গত মাসে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দাবানল বা একই সময়ে একাধিক চরম আবহাওয়ার যৌথ প্রভাব এ হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
তাদের ভাষ্যমতে, অত্যধিক গরম, খরা ও বন্যায় ইউরোপীয় অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতি ২০২৪ সালে মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় দশমিক ২৬ শতাংশের সমান।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সাইপ্রাস, গ্রিস, মাল্টা ও বুলগেরিয়ায়। প্রতিটি দেশই তাদের ২০২৪ সালের অর্থনীতিতে মোট সংযোজিত মূল্যের (জিভিএ) ১ শতাংশেরও বেশি হারিয়েছে। ক্ষতির তালিকায় এরপরের অবস্থানে রয়েছে স্পেন, ইতালি ও পর্তুগালের মতো কয়েকটি অন্যান্য ভূমধ্যসাগরীয় দেশ। প্রসঙ্গত, জিডিপির মতো জিভিএ-ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা পরিমাপের একটি সূচক।
সমীক্ষা প্রতিবেদনের প্রধান লেখক, গ্যেটে ইউনিভার্সিটি ফ্রাঙ্কফুর্টের অর্থনীতিবিদ সেহরিশ উসমান বলেন, ‘যেহেতু আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রায়ই বিলম্বিত হয়, এ গবেষণার ‘সময়োপযোগী হিসাব’ নীতিনির্ধারকদের জন্য তাৎক্ষণিক সহায়তা হিসেবে কাজে আসতে পারে। চরম আবহাওয়ার প্রকৃত ব্যয় প্রকাশ পায় ধীরে ধীরে। কারণ এ ধরনের ঘটনা জীবনের নানা ক্ষেত্র ও জীবিকার ওপর নানা মেয়াদে নানা মাত্রায় প্রভাব ফেলে, যা প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির চেয়েও বিস্তৃত হয়।’
গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্পেন ও পর্তুগালে দাবানলের মতো দুর্যোগের ঝুঁকি ৪০ গুণ বেড়েছে। গ্রিস ও তুরস্কে তা বেড়েছে ১০ গুণ। জুন মাসের এক বিধ্বংসী তাপপ্রবাহে ১২টি বড় শহরে মৃত্যুহার তিনগুণ বেড়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে, এক্ষেত্রে পৃথিবীর উষ্ণায়নকে বাড়িয়ে তোলা দূষণকে দায়ী করা হচ্ছে।
সমীক্ষার ফলাফলকে গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন বিশ্বব্যাংকের প্রধান জলবায়ু অর্থনীতিবিদ স্টেফান হ্যালেগাট। তিনি বলেন, ‘এ সমীক্ষা প্রমাণ করছে যে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার অর্থনৈতিক প্রভাব এর প্রত্যক্ষ ক্ষতির তুলনায় অনেক বেশি এবং মানুষের ধারণার চেয়েও বেশি দীর্ঘস্থায়ী। আমি অনেকদিন ধরেই বলছি, দুর্যোগের প্রত্যক্ষ ক্ষতির চেয়ে এর ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রভাবের দিকে নজর দেয়া উচিত। এ গবেষণায় ঠিক সেটিই করা হয়েছে দেখে আমি আনন্দিত। তবে সমীক্ষার সঙ্গে যুক্তরা চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার প্রভাব শনাক্তে ‘অসম্পূর্ণ সূচক’ ব্যবহার করেছেন, যা সম্ভবত প্রকৃত ব্যয়কে কমিয়ে দেখাচ্ছে।’















