চীন বিশ্বের শীর্ষ সয়াবিন আমদানিকারক দেশ। চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশটি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ৮ কোটি ৮৫ লাখ ১০ হাজার টন সয়াবিন আমদানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। চীনের বাজারে কৃষিপণ্যটির আমদানির এ পরিমাণ আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিনের মূল্য নির্ধারণে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। চীন সয়াবিনের আমদানি বাড়ালে কিংবা কমালে বাজারে কৃষিপণ্যটির দাম ওঠা-নামা করে। বিদায়ী বছরে কিছু ঘটনা চীনের সয়াবিন আমদানি খাতে বড় পরিবর্তন এনেছিল। প্রভাব পড়েছিল সয়াবিনের দামেও। 

আফ্রিকান সোয়াইন ফ্লু

চীনে আমদানি করা সয়াবিনের ৮০ শতাংশই পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আফ্রিকান সোয়াইন ফ্লুর আক্রমণে বিদায়ী বছরের প্রথম দিকে দেশটির অনেক পশু মারা যায়। দেশটিতে সয়াবিনের চাহিদা কমতে শুরু করে। তবে বছরের শেষ কয়েক মাসে এ পরিস্থিতি অনেকটা বদলেছে। 

চীনের কৃষি ও পল্লীবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জানিয়েছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর সময়ে দেশটিতে পশুখাদ্যের চাহিদা বেড়েছে। ডিসেম্বরে চাহিদা প্রবৃদ্ধি আগের মাসের তুলনায় ২ শতাংশ বেড়েছে। এসব কারণে বছরের শেষ দিকে এসে দেশটি সয়াবিন আমদানি বাড়িয়েছে। এছাড়া প্রাক ক্রয়াদেশের বিলম্বিত কার্গোগুলো নভেম্বর ও ডিসেম্বরে খালাস হয়েছে। ফলে এ দুই মাসে রেকর্ড সয়াবিন আমদানি করে চীন।

চীনা রাজস্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরে চীনে ৯৫ লাখ ৪০ হাজার টন সয়াবিন আমদানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৭ শতাংশ ও আগের মাসের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্য দিয়ে চীনে সয়াবিন আমদানি ১৯ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে।

আগের বছরের ডিসেম্বরে দেশটি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে মোট ৫৭ লাখ ২০ হাজার টন সয়াবিন আমদানি করে। আর বিদায়ী বছরের নভেম্বরে আমদানি করেছিল ৮২ লাখ ৮০ হাজার টন। সে হিসাবে এক বছর ও এক মাসের ব্যবধানে চীন পণ্যটির আমদানি যথাক্রমে ৩৮ লাখ ২০ হাজার ও ১২ লাখ ৬০ হাজার টন বাড়িয়েছে।

চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধ

২০১৯ সালজুড়ে বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়েছিল চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। ফলে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের বদলে ব্রাজিল থেকে সয়াবিন আমদানি বাড়িয়েছিল চীন। বাণিজ্যযুদ্ধ নিরসনে ১৫ জানুয়ারি বহুল আলোচিত প্রথম পর্যায়ের বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে দেশ দুটি। এর মাধ্যমে বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির দেশের মধ্যকার দীর্ঘ ১৮ মাস ধরে চলা বাণিজ্য বিরোধের অবসান ঘটবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতি বছর সয়াবিনসহ ৪-৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের কৃষিপণ্য ক্রয়ে চীনকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন। বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাবে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে ৩০ বছরের সর্বনিম্নে নেমেছে। ফলে দেশটির পক্ষে এ শর্ত পূরণ করে সয়াবিনসহ অন্যান্য পণ্য আমদানি বাড়ানো সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।

বাণিজ্যযুদ্ধ শুরুর আগে চীনে আমদানি করা সয়াবিনের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল যুক্তরাষ্ট্র। বাড়তি আমদানি শুল্কের জের ধরে একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্যটির আমদানি বন্ধ করে দেয় চীন। এ সুযোগে লাভবান হয়ে ওঠে ব্রাজিল। চীন এ মুহূর্তে মোট আমদানি করা সয়াবিনের ৮০ শতাংশ কিনছে ব্রাজিল থেকে। অপেক্ষাকৃত কম মূল্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘকালীন বাণিজ্য অনিশ্চয়তা দেশটিকে ব্রাজিলমুখী করে তুলেছে। তাই প্রথম পর্যায়ের বাণিজ্য চুক্তিটি কার্যকর হলে দেশটিকে ব্রাজিলের সাশ্রয়ী বাজার থেকে সরে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরতে হবে। এর প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিনের দামে।

            রয়টার্স ও এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল অবলম্বনে