বন্দর দিয়ে সব ধরনের কীটনাশক বা বালাইনাশক আমদানির ক্ষেত্রে ভারী ধাতুর উপস্থিতির পরীক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে এ নির্দেশনা দেয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। তবে আমদানিকারকদের অনুরোধে ভারী ধাতু পরীক্ষায় স্থগিতাদেশ দেয়া হয়, যা শেষ হবে ৩০ জুন। কিন্তু এরই মধ্যে এ নির্দেশনা স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার চেয়েছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল। এজন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ স্থগিতাদেশ স্থায়ী প্রত্যাহার কার্যকর হলে জনস্বাস্থ্যের জন্য সেটি বড় হুমকি হবে।

ফসল উৎপাদনে রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহার করা হয় কীটনাশক বা বালাইনাশক। এজন্য দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩৮ হাজার টন কীটনাশক বা বালাইনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। এসব কীটনাশক বা বালাইনাশকে থাকা হেভি মেটাল বা ভারী ধাতু মাটি, পানি, সারের মাধ্যমে প্রবেশ করছে খাদ্য চেইনে। যদিও এর পর্যবেক্ষণে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের সক্ষমতার বড় ঘাটতি রয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম কর্তৃপক্ষ বলছে, বালাইনাশক নমুনা পরীক্ষায় ক্ষতিকর ভারী ধাতু লেড, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়াম রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সংস্থাটি এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি একটি নির্দেশনা দেয়। যেখানে আমদানি করা কীটনাশক বন্দর থেকে ছাড় করার আগে দুটি মনোনীত সরকারি পরীক্ষাগারে বাধ্যতামূলক পরীক্ষার কথা বলা হয়। এরপর ছাড়পত্র সাপেক্ষে বন্দর হতে খালাসের ব্যাপারে নির্দেশনা জারি হয়।

তবে আমদানিকারকদের অনুরোধে ভারী ধাতুর পরীক্ষায় গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় দফায় স্থগিতাদেশের মেয়াদ চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে এখন আর স্থগিতাদেশটির মেয়াদ না বাড়িয়ে বরং স্থায়ীভাবে প্রত্যাহারই চাওয়া হয়েছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের পক্ষ থেকে।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, আমদানি হওয়া কীটনাশক পরীক্ষার ব্যাপারে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপটি দুবার পিছিয়েছে। আমরা আগামী ১ জুলাই থেকে বন্দর থেকে কীটনাশক ছাড়করণের আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করব কিনা সেটা মূলত নির্ভর করছে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর।

বালাইনাশকে ভারী ধাতুর উপস্থিতির বিষয়ে বালাইনাশক আইন ২০১৮ বা বালাইনাশক বিধি ১৯৮৫, বালাইনাশক বিধি (সংশোধিত ) ২০১০-এ কিংবা বালাইনাশক নিবন্ধন ফরম ১(ক), ১(খ), ১(গ)-তে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ নেই। তাই প্রথা অনুযায়ী বালাইনাশক ২০১৮ আইনের ১৯ ধারা অনুসরণ করে বালাইনাশক ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ কার্যকরী উপদেষ্টা কমিটি (পিটাক) সভায় মতামত আহ্বান করা হয়েছিল। সেখানেও খাদ্যশৃঙ্খলে মাটি, সার, সেচের পানি, বালাইনাশকের মাধ্যমে ভারী ধাতু প্রবেশ করার বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়। এ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা ও বালাইনাশকে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নির্ণয়ের জন্য সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা নির্ধারণ এবং প্রটোকল নির্বাচনের সুপারিশ করা হয়। তবে বাংলাদেশে প্রচলিত বালাইনাশক আইন ও বিধিমালা এবং বালাইনাশক-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এফএও কিংবা ডব্লি্উএইচও প্রদত্ত কোনো সুপারিশ ও নীতিমালায় বালাইনাশকে ভারী ধাতু, এর পরীক্ষা পদ্ধতি ও সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা উল্লেখ নেই। এ কারণে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ পরিচালিত পরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ভারী ধাতুর পরিমাণ উচ্চমাত্রার কিনা তা স্বীকৃত নয় বলে মতামত দেয়া হয়।

মূলত পিটাকের ৮১তম সভাতেই এনবিআর ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে দেয়া নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পত্রের নির্দেশনা রহিত করার আবেদন জানানোর বিষয়ে দেয়া সুপারিশ গ্রহণ করা হয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান ও পিটাকের চেয়ারম্যান ড. শেখ মোহাম্মদ বখতিয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনা করে স্থায়ীভাবে প্রত্যাহারের প্রয়োজনীয় নির্দেশনাপত্র প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। এ নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। সেইসঙ্গে ৮২তম পিটাক সভার সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের ব্যবস্থা গ্রহণে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মাহফুজুর রহমান এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, কীটনাশকের ক্ষতিকর ধাতু পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়টি জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত। এটা কৃষি মন্ত্রণালয়ের এককভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা বাস্তবায়নের মতো ইস্যু নয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে কিনা তা নিশ্চিত না হয়ে জাহাজ থেকেই পণ্যের চালান নামার অনুমতি দেয় না সেখানকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আর আমাদের দেশে তো রীতিমতো সর্বনাশ চলছে। দেশে ফসল উৎপাদনের বিবেচনায় যেসব সীমাবদ্ধতা রয়েছে সেগুলো কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েই পদক্ষেপ নিতে হবে। এভাবে সরকারি একটি সংস্থারই জনস্বাস্থ্যের জন্য গৃহীত ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ বা সিদ্ধান্তকে প্রত্যাহার কিংবা পাশ কাটিয়ে যাওয়া মোটেও ঠিক হবে না। বালাইনাশকে যে ভারী ধাতুর উপস্থিতির প্রমাণ মেলার কথা বলা হচ্ছে—এগুলো অ্যাবনরমাল কেমিক্যাল, যেটা শরীরে প্রবেশ করে সেল নষ্ট করে দেয়। এতে ক্যান্সারসহ বড় ধরনের রোগের ঝুঁকি তৈরি করে। মানবসম্পদের বড় ধরনের ক্ষতির পাশাপাশি এ ধরনের ভারী মেটাল ইকোসিস্টেমের জন্য বড় হুমকি।