দেশের অবকাঠামাগত উন্নয়নে বেশ কয়েকটি মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নে কাজ চলছে। পাশাপাশি এগিয়েছে বেসরকারি খাতের ভারী শিল্পও। এ দুইয়ের ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হওয়া হেভি ওয়েট কার্গো (ভারী পণ্য) খালাসের পরিমাণ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে বহুগুণ। যে কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে ৪০ টনের উপরে ভারী পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে গড় প্রবৃদ্ধি প্রায় ৮৫ শতাংশ। অথচ হেভি ওয়েট কার্গো খালাসের জন্য উপযুক্ত কোনো সক্ষমতাই এখন পর্যন্ত গড়ে তোলা হয়নি। ফলে বন্দরে ভারী মালামাল হ্যান্ডলিং, স্টোরেজ, বোঝাই এমনকি পরিবহন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেই সঙ্গে ব্যয়বহুলও। এ অবস্থায় সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে এর কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যাঘাত ঘটলে যেকোনো সময় ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বন্দর ব্যবহারকারী ভারী শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশের শিল্প খাতের উন্নয়ন হওয়ায় এখন অনেক বেশি পরিমাণে শিল্প পণ্য আসছে। এ ধরনের পণ্যের আকার এবং ওজন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। অথচ ভারী পণ্য বা হেভি ওয়েট কার্গো খালাসের জন্য বন্দরে নির্দিষ্ট কোনো জেটি প্রস্তুত করা হয়নি। এ ধরনের পণ্য বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি জেটিতে খালাস হলেও সেখানে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ বেড়েছে ব্যাপক হারে। এছাড়া পানগাঁওগামী কনটেইনার জাহাজ এবং কোস্টাল শিপ বেড়ে যাওয়ায় এনসিটিতে সব সময় বার্থ খালিও পাওয়া যায় না। ফলে ভারী পণ্য খালাসের কাজে বিঘ্ন ঘটছে। সরকারের বড় বড় প্রকল্পের ও ভারী শিল্পের পণ্য হ্যান্ডলিং ও খালাসের কাজ স্বাভাবিক রাখতে কমপক্ষে ২৫০ টন ওজনের পণ্য হ্যান্ডলিং উপযোগী বিশেষায়িত জেটি অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিভাগকে দেয়া বন্দরেরই ট্রাফিক বিভাগের (অপারেশন) চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, হেভি ওয়েট কার্গো খালাস কার্যক্রম সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে না পারলে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে এবং দেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কার্যক্রম বড় পরিসরে ব্যাহত হতে পারে।

চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে পরিচালন কার্যক্রম বিশ্লেষণ করেছে বণিক বার্তা। এতে দেখা গেছে, দেশের প্রধান এ সমুদ্রবন্দরে ভারী কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের জন্য বিশেষায়িত কোনো জেটি ও সুবিধাদি নির্মাণ না করার ফলে ভারী কার্গো ল্যান্ডিং ও হ্যান্ডলিংয়ের জন্য এনসিটি ৫ নম্বর বার্থ ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু এনসিটি বার্থ মূলত কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য ডিজাইন ও নির্মাণ করা হয়েছে। এই বার্থের বা জেটির ভার বহনক্ষমতা প্রতি বর্গমিটারে তিন টন। অথচ ২০১৮-১৯ অর্থবছরেই এনসিটি পাঁচ নম্বর বার্থে ৪০ টনের উপরে ভারী মালামালই হ্যান্ডলিং হয়েছে ৩১ হাজার ৬৮৮ টন। আগের বছরের সঙ্গে তুলনা করলে এর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১০১ শতাংশ। অর্থাৎ ২০১৭-১৮ বছরে এ ধরনের ভারী পণ্য হ্যান্ডলিং হয়েছিল ১৫ হাজার ৭৫৯ টন। এখন ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মেকানিক্যাল ডিভাইস ব্যবহার করে লোড ডিস্ট্রিবিউশনের মাধ্যমে জাহাজের ক্রেনের সাহোয্যে ভারী কার্গো ল্যান্ডিংয়ের কাজ করা হচ্ছে। এতে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটাসহ জেটি ক্র্যাক হওয়ার সম্ভাবনা থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে খোদ বন্দর কর্তৃপক্ষেরই নিজস্ব একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনেও।

বন্দর ব্যবহার করে ভারী পণ্য আমদানি করছেন এমন ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরে হেভি ওয়েট কার্গো খালাসের সক্ষমতা গড়ে তোলা হলে এ ধরনের পণ্য ডিসচার্জিংয়ের জন্য জাহাজের শিফটিং সংক্রান্ত জটিলতা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এতে করে অনায়াসেই চট্টগ্রাম বন্দরে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ বাড়বে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ইস্পাত প্রস্তুতকারক বিএসআরএমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমের আল হোসাইন এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারিভাবে বড় বড় প্রকল্পের কাজ চলছে। আবার বেসরকারি খাতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট হওয়ায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পণ্য আসা বেড়েছে বহুগুণ। ফলে হেভি ওয়েট কার্গো খালাসে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেয়ার অপরিহার্যতা রয়েছে অর্থনৈতিক স্বার্থেই। এজন্য আলাদাভাবে একটি বিশেষায়িত জেটি থাকা জরুরি। হেভি কর্গো খালাসের উপযোগী জেটি নির্মাণ করা হলে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রডাক্টিভিটিও বাড়বে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বে-টার্মিনালকে ফুল প্লেজে পোর্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর কাজটি দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিতে হবে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, চট্টগ্রাম বন্দরে পশ্চাৎ সুবিধাসহ হেভি লিফট কার্গো জেটি নির্মাণে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করতে রাজি আছে। খালি জায়গা থাকায় বন্দরের ১৩ নম্বর জেটির পাশে এ ধরনের পণ্য খালাসের জন্য একটি জেটি নির্মাণের সুযোগও রয়েছে। তবে নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িতব্য প্রকল্পের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল হতে লিকুইডিটি সার্টিফিকেট পেতে হবে। এর বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পর্ষদের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, প্রথম কথা হলো এ ধরনের একটি প্রকল্পের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের লিকুইডিটি সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হবে। আরো বিষয় রয়েছে। হেভি লিফট কার্গো সাধারণত বার্জে করে আসছে। সেক্ষেত্রে মাতারবাড়ীতেও এ ধরনের পণ্য অপারেশন ও খালাসের ব্যবস্থা থাকবে। বার্জে ছাড়াও হেভি কার্গো ব্রেক করে অর্থাৎ ভেঙে আসে। এদিকে আগামী ছয়-সাত বছরের মধ্যে বে-টার্মিনাল হয়ে যাবে। এটা হওয়ার পর অপারেশনাল কার্যক্রমের গুরুত্ব এই টার্মিনাল ঘিরেই হবে। এছাড়া সামনের দিনগুলোয় ছোট জাহাজ তৈরি কমে আসছে এবং এটা কস্টলি হবে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে ৯ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটে একটি হেভি লিফট কার্গো জেটি প্রস্তুত করার বিষয়টি আরো পর্যালোচনার বিষয় আছে।

দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বাস্তবায়নে থাকা সরকারের মেগা প্রজেক্টের মধ্যে রয়েছে পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা সমুদ্রবন্দর, মিরসরাই ইকোনমিক জোন, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল প্রভৃতি। এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হওয়ায় প্রজেক্ট কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ ব্যাপক হারে বেড়েছে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে ভারী পণ্য খালাসের পরিমাণ আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। যদিও চট্টগ্রাম বন্দরে ভারী পণ্য খালাসের জন্য নির্দিষ্ট কোনো জেটি নেই।

চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারী ফোরাম ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, অত্যধিক ভারী মালামাল হ্যান্ডলিংয়ের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ হেভি লিফট কার্গো জেটি প্রস্তুত করার চাহিদা আরো আগে থেকেই ছিল। বন্দরের উৎপাদনশীল কার্যক্রম বাড়াতেই এ ভারী পণ্যের সক্ষমতা গড়ে তোলা খুবই জরুরি। এর বাস্তবায়নে অনাকাঙ্ক্ষিত জট ও জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইমও উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। ফলে বন্দর ব্যবহারে ব্যয় হ্রাস পাওয়া ছাড়াও জাতীয় অর্থনীতিতে এর অনুকূল প্রভাব পড়বে।