সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর প্রথমবারের মতো বৈঠকে বসেছিল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানিকারক দেশগুলোর প্রভাবশালী জোট ওপেক প্লাস। রোববার অনুষ্ঠিত এক অনলাইন সভায় জোটের সদস্যদেশগুলো আগামী জুন মাসের জন্য জ্বালানি তেলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা আবারও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ নিয়ে টানা তৃতীয় মাসের মতো জ্বালানি তেলের উৎপাদন কোটা বৃদ্ধির ঘোষণা। তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জ্বালানি তেলের এই উৎপাদন বৃদ্ধি আপাতত কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। খবর রয়টার্স ও গলফ নিউজ।
রোববারের বৈঠকে সৌদি আরব ও রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন সাতটি দেশ আগামী জুন মাসের জন্য প্রতিদিন ১ লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল অতিরিক্ত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উৎপাদনের বিষয়ে একমত হয়েছে। জোটের অন্য দেশগুলো হলো ইরাক, কুয়েত, আলজেরিয়া, কাজাখস্তান ও ওমান। এর আগে এপ্রিল ও মে মাসেও একইভাবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের উৎপাদন কোটা বাড়ানো হয়েছিল। মূলত আমিরাত জোট ছাড়ার পর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও ঐক্য প্রদর্শনের জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
রাইস্টাড এনার্জির বিশ্লেষক এবং ওপেকের সাবেক কর্মকর্তা জর্জ লিওন বলেন, তেলের বাজারে একটি ‘স্বাভাবিক’ পরিস্থিতি বজায় রয়েছে—এমন বার্তা দিতেই ওপেক প্লাস এই পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ১ মে সংযুক্ত আরব আমিরাত আনুষ্ঠানিকভাবে ওপেক ও ওপেক প্লাস থেকে নিজেদের সদস্যপদ থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। জোটের অন্যতম প্রভাবশালী এই সদস্যের আকস্মিক বিদায়ের পর ওপেক প্লাস কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে সংশয় দেখা দিয়েছিল। তার মতে, বাজারের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতেই ওপেক প্লাস ৩য় দফায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের উৎপাদন বাড়াচ্ছে।
তবে কাগজে-কলমে উৎপাদন বাড়ানোর ঘোষণা এলেও বাস্তবে বিশ্ববাজারে এর প্রভাব পড়বে খুবই সামান্য। গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বর্তমানে অবরুদ্ধ হয়ে আছে। এই পথ দিয়েই মূলত সৌদি আরব, ইরাক ও কুয়েতের মতো দেশগুলো তাদের জ্বালানি তেল রফতানি করে থাকে। প্রণালিটি বন্ধ থাকায় এই দেশগুলো চাইলেও এখন জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়াতে পারছে না। রফতানি সংকটের কারণে কুয়েত গত এপ্রিলে কোনো অপরিশোধিত তেল রফতানি করতে পারেনি, যা ১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম। ফলে ওপেক প্লাসের এই সিদ্ধান্ত আপাতত একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবেই রয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ১২৫ ডলারের উপরে বিক্রি হচ্ছে। জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে উড়োজাহাজের জ্বালানি বা জেট ফুয়েলের সংকট দেখা দিতে পারে। গত মার্চের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রফতানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সৌদি আরব ও ইরাকের মতো দেশগুলোর প্রকৃত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রতিদিন প্রায় ৭৭ লাখ ব্যারেল কমে গেছে।
দ্য হিন্দু বিজনেসলাইন পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই নিজেদের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ‘আদনক’-এর মাধ্যমে জ্বালানি তেল খাতে ৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। মূলত নিজেদের জ্বালানি তেলের উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতেই তারা দীর্ঘদিনের পুরোনো এই জোট ত্যাগ করেছে। আমিরাত মনে করছে, বর্তমানে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে জোটের বাধ্যবাধকতা ছাড়াই তারা স্বাধীনভাবে বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারবে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ওপেকের মোট তেল রফতানির প্রায় ১৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত আরব আমিরাত। তাদের এই চলে যাওয়া জোটের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতাকে কিছুটা দুর্বল করতে পারে। যদিও রোববারের বৈঠকে আমিরাতের বিদায় নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি। বরং জোটের পক্ষ থেকে বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষার ওপরই বেশি জোর দেয়া হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে জ্বালানি ব্যবসায়ীরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি আজই হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়া হয়, তবুও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস সময় লেগে যাবে। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা বেশ সময়সাপেক্ষ। এমন পরিস্থিতিতে ওপেক প্লাসের সাতটি দেশ আগামী ৭ জুন আবারও বৈঠকে বসার কথা জানিয়েছে। আপাতত বিশ্ববাসী তাকিয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির দিকে, কারণ এই যুদ্ধের অবসানের ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রকৃত সরবরাহ।










