বেনাপোল কাস্টমসের রাজস্ব আহরণের সিংহভাগ আসে উচ্চ শুল্কযুক্ত গাড়ির চেসিস ও মোটর পার্টস আমদানি থেকে। কিন্তু করোনার কারণে গাড়ি ও মোটর পার্টসের চাহিদা কমে যাওয়ায় এর আমদানিও কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে কাস্টমসের রাজস্ব আহরণের ওপর। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আদায় কমে গেছে বেনাপোল কাস্টমসের।

বেনাপোল কাস্টমস অফিসের তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে দেশের বাজারে উচ্চ শুল্কযুক্ত এ দুটি পণ্যের চাহিদায় ধস নামে। ফলে বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ীরা এটির আমদানিও কমিয়ে দেন। যে কারণে গত বছর বেনাপোল বন্দর দিয়ে পণ্য দুটির আমদানি আগের বছরের অর্থাৎ ২০১৯ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যায়।

বেনাপোল কাস্টম অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে চেসিস আমদানি হয়েছে ২৮ হাজার ২৪২টি, যেখানে এর আগের বছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ৫২ হাজার ৩২০টি। অন্যদিকে ওই বছরে মোটর পার্টস আমদানি হয়েছে ১ কোটি ৫৪ লাখ ৬৫ হাজার ৫৬৭ কেজি। যেখানে এর আগের বছরে আমদানি ছিল ১ কোটি ৮২ লাখ ৯৮ হাজার ৩১০ কেজি।

সব মিলিয়ে গত পাঁচ বছরে বেনাপোল দিয়ে ১৭ হাজার ২৯৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা মূল্যের ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৭২৮টি গাড়ির চেসিস আমদানি হয়েছে। আর মোটর পার্টস আমদানি হয়েছে ৮ কোটি ৪৩ লাখ ৩০ হাজার ৭৮২ কেজি, যার মূল্য ২ হাজার ১৯৫ কোটি ৬১ লাখ। এরমধ্যে ২০১৬ সালে চেসিস আমদানি হয়েছে ৭৯ হাজার ৭১৪টি ও মোটর পার্টস ১ কোটি ৪১ লাখ ২৪৪ কেজি। ২০১৭ সালে চেসিস আমদানি হয়েছে ৯১ হাজার ৪৮১টি ও মোটর পার্টস ১ কোটি ৭০ লাখ ৭৬ হাজার ৩৩৬ কেজি। ২০১৮ সালে চেসিস আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৭১টি। এ সময়ে মোটর পার্টস আমদানি হয়েছে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৯০ হাজার ৩২৩ কেজি।

এদিকে উচ্চ শুল্কযুক্ত এ দুটি পণ্য আমদানির বড় প্রভাব পড়েছে কাস্টমসের রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে। তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ হাজার ২৪৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৯৯৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ হাজার ৮৮৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। সেই হিসাবে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে ১ হাজার ১০৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা। তবে ২০১৯-২০ অর্থবছরের ছয় মাসের তুলনায় রাজস্ব বেড়েছে ৩৪২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। সেই হিসাবে রাজস্ব আহরণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২২ দশমিক ১২ শতাংশ। এর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমসে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছিল ৩ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা।

করোনাভাইরাস-পূর্ববর্তী কয়েক বছর ধরে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আমদানির পরিমাণ বাড়ছে। এর মধ্যে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বন্দরটি দিয়ে আমদানি হয়েছে ১২ লাখ ৭১ হাজার টন পণ্য। এছাড়া ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ১৩ লাখ ৫৪ হাজার ৯৪২ টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১২ লাখ ৮৩ হাজার ৮৭৫ টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৫ লাখ ১৯ হাজার ২২০ টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৯ লাখ ৮৮ হাজার ৩৯৭ টন এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমদানি করা হয়েছে ২০ লাখ ১১ হাজার ৬ টন পণ্য। ব্যবসায়ীরা বলছেন, উচ্চ শুল্কযুক্ত হওয়ায় গাড়ির চেসিস ও মোটর পার্টসের আমদানি কমবেশির ওপর রাজস্ব আহরণের ছন্দপতন নির্ভর করে।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, গাড়ির চেসিস ও মোটর পার্টস আমদানি বেশি হলে রাজস্ব আহরণ বাড়ে। সে কারণে কম শুল্কযুক্ত পণ্য আমদানি বাড়লেও রাজস্ব কমবে এটাই স্বাভাবিক।

করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে এ খাতের ব্যবসায় মন্দার প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন বেনাপোল আমদানি-রফতানি সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি আমিনুল হক। তিনি বলেন, করোনার কারণে গাড়ির ব্যবসা মন্দা থাকায় চেসিস আমদানি বেশি কমেছে। আর মোটর পার্টস আমদানিও এখন কমছে।

একই ধরনের কথা জানালেন যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান খান। তিনি বলেন, করোনার কারণে সব ব্যবসায় ধস নেমেছে। বেশি নেমেছে গাড়ির ব্যবসায়। কারণ মানুষের কাছে নগদ টাকার প্রবাহ বেশি থাকলে তখন তারা গাড়ি কিনতে ও পার্টস বদলাতে উৎসাহী হন। আবার বেনাপোল বন্দরের সক্ষমতার অভাব এবং পণ্য চুরি হওয়ার কারণে অনেকে বন্দর ছেড়ে অন্য বন্দরে চলে যাচ্ছেন।

এদিকে বন্দরের সক্ষমতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর জন্য কাজ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন জায়গা অধিগ্রহণ ও আমদানি পণ্যের নিরাপত্তায় সিসি ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছেন বেনাপোল বন্দর উপপরিচালক (ট্রাফিক) মামুন কবীর। এসব কার্যক্রম চালু হলে এ বন্দর দিয়ে আমদানির সঙ্গে রাজস্বও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

এ ব্যাপারে বেনাপোল কাস্টম হাউজের কমিশনার মো. আজিজুর রহমান জানান, করোনার কারণে দেশের ব্যবসায় মন্দা থাকায় গাড়ির চেসিস ও মোটর পার্টস আমদানি কিছুটা কমেছে। তবে চলতি বছর আশা করছি আমদানি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে আমাদের রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ২২ দশমিক ১২ শতাংশ। বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।