বিশ্বের চা উৎপাদনে পঞ্চম বাংলাদেশ। চাহিদা বেশি থাকায় আমদানি কমিয়ে উৎপাদন বাড়াতে এরই মধ্যে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কসহ ৮৯ শতাংশ শুল্কারোপ করেছে সরকার। এতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমদানি কমে এসেছে। কিন্তু রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন বৃদ্ধিই এখন গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে বাগান মালিকদের। লক্ষ্যমাত্রা ও দেশীয় চাহিদার প্রায় সমান উৎপাদনের পরও কস্ট অব প্রডাকশনের (সিওপি) চেয়ে কম দামে বিক্রি হচ্ছে চা। এতে চা খাতে নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়া, বাগান বিক্রি করে দেয়া ছাড়াও চা উৎপাদনে বড় ক্ষত তৈরি হচ্ছে।

দেশে চা উৎপাদন প্রতি বছরই প্রায় রেকর্ড উৎপাদনের দিকে যাচ্ছে। এর পরও উৎপাদন খরচের সঙ্গে তাল মিলিয়ে লোকসানের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছেন বাগান মালিকরা। আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপের পরও দেশীয় উদ্যোক্তারা ভালো দামে কেন চা বিক্রি করতে পারছেন না, সে বিষয়ে উৎপাদক ও ক্রেতার পাল্টাপাল্টি বক্তব্য রয়েছে। গত এক যুগে মজুরি, জ্বালানি, প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন খরচ বাড়লেও চায়ের দাম তুলনামূলক কমেছে। করোনাকালীন সংকটের পর চায়ের বাজার চাঙা হলেও এ সময়ে বড় ধরনের লোকসানে পড়ছেন বাগান মালিকরা। এতে চা খাত উদ্যোক্তাদের মধ্যে বাগান বিক্রির প্রবণতা বাড়ছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রফতানিতে পিছিয়ে পড়া, প্রতিযোগী দেশগুলোর কম দামে মানসম্পন্ন চা উৎপাদন ছাড়াও উৎপাদন বৃদ্ধিজনিত কারণে দেশীয় উৎপাদকরা চা খাতে লাভ করতে পারছেন না। একই সঙ্গে দেশীয় ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক দামে চা ক্রয়ে অনীহায় প্রতিটি নিলামেই অবিক্রীত থাকছে বিপুল পরিমাণ চা।

টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, নিলামে বিক্রি হওয়া ৬০ শতাংশের ক্রেতা পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। যার মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানই মোট চায়ের এক-পঞ্চমাংশের বেশি চা ক্রয় করে। বড় ক্রেতা ছাড়াও দশমিক শূন্য ৫ শতাংশের বেশি ক্রেতা রয়েছেন আরো ৩০ জন। শীর্ষ পাঁচ ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের কারণে বাগান মালিকরা উৎপাদিত চায়ের দাম ঘোষণা সত্ত্বেও নিলামে বিক্রি হচ্ছে না। বিষয়টি স্বীকার করেছেন চা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী, ব্রোকার্স প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ চা বোর্ডও।

দেশে চা ক্রেতাদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ইস্পাহানি চা কোম্পানি। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে আবুল খায়ের কনজিউমার প্রডাক্টস লিমিটেড। তৃতীয় স্থানে মেঘনা টি, চতুর্থ ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড এবং চা ক্রয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে ড্যানিশ ফুডস লিমিটেড। দেশের আনুষ্ঠানিক সাড়ে ৯ লাখ কোটি কেজি চায়ের বাজারে ৩০টির মতো ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের কারণে চা বিপণন কার্যক্রম প্রতিযোগিতামূলক নয় বলে দাবি করেছেন বাগান মালিকরাও।

ব্রোকার্স প্রতিষ্ঠানের দেয়া তথ্যে দেখা গেছে, ২০১২-১৩ মৌসুমে এক বছরে চা বিক্রির বার্ষিক গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি ২১৯ টাকা। মাঝের কয়েক মৌসুমে চায়ের গড় দামে উত্থান-পতন থাকলেও ২০১৮-১৯ মৌসুমে চায়ের দাম কেজিপ্রতি রেকর্ড ২৬২ টাকায় উঠে যায়। এরপর চায়ের দাম দুই দফায় বাড়ানো হলেও সর্বশেষ কয়েক মৌসুমে চায়ের গড় দাম কেজিপ্রতি ১৯০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। সর্বশেষ ২০২১-২২ নিলাম মৌসুমে চায়ের গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি ১৯১ টাকা ৭৫ পয়সা। ২০২২-২৩ মৌসুমে গড় দাম ছিল ১৯৬ টাকা ৭৬ পয়সা। ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত দেশে চায়ের শীর্ষ নিলাম কেন্দ্র চট্টগ্রামের ২৭তম নিলামে গড় চা বিক্রি হয়েছে ১৯৫ দশমিক ৮২ টাকা। আগামী ১৮টি নিলামে চায়ের দাম স্বাভাবিকভাবে কমে যাবে। ফলে শেষ পর্যন্ত চলতি মৌসুমে চায়ের গড় দাম ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাগান মালিকরা।

চা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, চা বোর্ডের নিজস্ব বাগান রয়েছে তিনটি। এ তিনটি বাগানের বর্তমানে সিওপি ২৩০ থেকে ২৪০ টাকা। দেশের অন্যান্য বাগানেও চায়ের গড় সিওপি ২০০ টাকার বেশি। কিন্তু উৎপাদিত এসব চা নিলামে বিক্রি করতে হচ্ছে ২০০ টাকারও নিচে। ফলে মুষ্টিমেয় কিছু বাগান মালিক লাভ করলেও অধিকাংশই রয়েছেন লোকসানে, যা ভবিষ্যতে দেশে কাঙ্ক্ষিত চা উৎপাদন কমে আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধি ও স্বনির্ভর চা খাতকে বড় বিপদে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশীয় চা সংসদের চট্টগ্রাম ব্রাঞ্চ কমিটির চেয়ারম্যান আবুল বাশার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্ডার দিয়ে ভারত থেকে অবৈধ পন্থায় চা প্রবেশ, নিলামে ভালো দাম না পাওয়ায় মুষ্টিমেয় কিছু বাগান ছাড়া সবাই লোকসানের মধ্যে রয়েছে। এ সংকট থেকে উত্তরণে চায়ের ন্যূনতম দাম বেঁধে দেয়াসহ অবৈধ চায়ের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর ভূমিকা নেয়া উচিত।’

চা খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিলামের মাধ্যমে চা বিক্রি হওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে কারসাজির অভিযোগ দেয়া যাচ্ছে না। চা বিপণনে ন্যূনতম দাম নির্ধারণ, বর্ডার দিয়ে চা প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা অব্যাহত রাখাসহ চা নীতিমালা সংশোধন জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

চায়ের দাম পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সর্বশেষ কয়েকটি নিলামেও চায়ের দাম অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় বড় লোকসানের মুখে পড়েছেন বাগান মালিকরা। গত মাসে অনুষ্ঠিত ২৫ নম্বর চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক নিলামে চায়ের কেজিপ্রতি গড় দাম ছিল ১৬১ দশমিক ৯১ টাকা। যদিও ২০২২-২৩ নিলাম বর্ষের একই নিলামে চায়ের গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি ২০৪ টাকা। অন্যদিকে ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ২৬ নম্বর নিলামে বাগানগুলো চায়ের গড় দাম পেয়েছে ১৮০ দশমিক ৪২ টাকা। আগের বছর একই নিলামে কেজিপ্রতি দাম ছিল ২০৫ দশমিক ২৭ টাকা।

বাগান ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪-১৫ সালের দিকে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ছিল ৮৫ টাকা। ২০১৭-১৮ সালের দিকে মজুরি বাড়িয়ে ১০২ টাকা করা হয়। এরপর ২০১৯-২০ সালের দিকে মজুরি আরেক দফা বাড়িয়ে ১২০ টাকা করা হয়েছে। ২০২২ সালে শ্রমিকদের টানা তিন সপ্তাহের সর্বাত্মক ধর্মঘটের পর শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি বাড়িয়ে ১৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। শ্রমিকদের সঙ্গে হওয়া ওই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। আগামী বছর শ্রমিক মজুরি ফের বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না।

বাংলাদেশীয় চা সংসদের সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চায়ের দাম অস্বাভাবিক কমে যাওয়ার বিষয়ে আমরা খুবই শঙ্কিত। যারা বাগানের চা কিনে নিয়ে ব্র্যান্ডিং করে তাদের প্যাকেটজাত চায়ের দাম ঠিক বেড়েছে। খুচরা পর্যায়ে এককাপ চায়ের দামও বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। কিন্তু যারা উৎপাদক তারাই লোকসানে রয়েছে। এটা মেনে নেয়া যায় না।’ এভাবে চলতে থাকলে অনেক চা বাগান বন্ধ কিংবা উৎপাদনে ধস নামার মাধ্যমেই চায়ের বাজার স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় থাকবে না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।