সরকারের পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলায় নজরদারি বাড়ায় স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি এখন বড় সংকটের মুখে। অন্যদিকে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি কমে যাওয়ায় সীমিত হয়ে পড়েছে ইয়ার্ডের কার্যক্রম। ইয়ার্ডগুলোতে স্ক্র্যাপ জাহাজ না থাকায় অনেক ইয়ার্ড একদিকে যেমন বন্ধ হয়ে গিয়েছে, অন্যদিকে কাজ না থাকায় বড় বিপাকে আছে শ্রমিকরা। অন্য বছরগুলোয় প্রতি মাসে যেখানে ২০ থেকে ২৫টি স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করা হতো, এখন সেখানে গত দুই মাসে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি হয়েছে মাত্র ১৭টি। অন্যদিকে ডলার সংকটে নতুন এলসি না হওয়ায় আগামীতে এ শিল্প খাতটি আরো বড় সংকটে পড়বে বলে শঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করতে ১৫০-২০০ কোটি টাকা খরচ করে থাকেন মালিকরা। কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে এ খাতটি এখন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। যদি এ এলসি-সংক্রান্ত জটিলতা সহসা না কমে তাহলে এখন কিছুটা চালু থাকলেও সেটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে বাজারে স্ক্র্যাপের পর্যাপ্ত চাহিদা থাকলেও সেটিও সংকটের কারণে সরবরাহ করতে পারছে না ইয়ার্ডগুলো।

বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত আগস্টে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করা হয়েছে মাত্র নয়টি, যার সম্মিলিত ওজন ছিল ৪৮ হাজার ১০০ টন। অন্যদিকে গত জুলাই মাসে ৮টি স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করা হলেও তার ওজন ছিল ৫৬ হাজার ৮৪ টন। অর্থাৎ আগস্টে জাহাজ আমদানি একটি জাহাজ বাড়লেও জুলাইয়ের তুলনায় কম ওজনের স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করা হয়েছে। এলসি-সংক্রান্ত জটিলতায় ছোট সাইজের স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করা হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বাজারে। সার্বিকভাবে ২০২১ সালের প্রথম আট মাসে ১৯ লাখ ৩৭ হাজার ৫০৭ টনের ২০০টি জাহাজ আমদানি করা হয়, সেখানে চলতি বছরের আট মাসে ৮ লাখ ৭ হাজার ৩১৫ টনের ১০২টি জাহাজ আমদানি করা হয়েছে। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে আমদানি কমেছে অর্ধেকেরও অনেক কম ওজনের স্ক্র্যাপ জাহাজ।

এদিকে জাহাজ ভাঙা শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিএসবিআরএর সহকারী সচিব নাজমুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে জানান, এলসি-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে শিপ ইয়ার্ডগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকারের আমদানি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না হলে বেশির ভাগ ইয়ার্ড বন্ধ রাখতে হবে। তাকে শ্রমিকদের কাজ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের সংকটের সম্মুখীন হচ্ছেন।

ইনভেস্ট ডটকমের তথ্যমতে, গতকাল ৯ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে টনপ্রতি স্ক্র্যাপ বিক্রি হয় ৩৬৮ ডলার। ৮ সেপ্টেম্বর বিক্রি হয় ৩৬৫ ডলারে। অথচ এক মাস আগে ১১ আগস্টও স্ক্র্যাপ বিক্রি হয় ৩৯৪ দশমিক ৫০ ডলারে। এদিকে দেশের বাজারে টনপ্রতি স্ক্র্যাপ বিক্রি হচ্ছে ৬০-৬৫ হাজার টাকায়। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের দাম কমে যাওয়া, অন্যদিকে বাংলাদেশে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি কমে যাওয়ায় দেশের বাজারের চাহিদা থাকলেও চাহিদামতো স্ক্র্যাপ সরবরাহ করতে পারছে না ইয়ার্ডগুলো।

ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের বাজারে স্ক্র্যাপের চাহিদা প্রচুর থাকলেও শিপ ইয়ার্ডগুলো সেটা সরবরাহ করতে পারছে না। জাহাজ আমদানির এলসি প্রায় বন্ধ। এলসি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি ইয়ার্ড তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এমনিতেই দেশে নিবন্ধিত ইয়ার্ড প্রায় ১৮৫টি থাকলেও চালু আছে হাতে গোনা ৪০-৫০টি শিপ ইয়ার্ড। অন্যদিকে এ চালু থাকা শিপ ইয়ার্ডগুলোর মধ্যে অনেকগুলো ঠিকাদারি প্রথার মাধ্যমে কাজ হয়। সেখানে স্ক্র্যাপ জাহাজ যদি আমদানিই বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে শ্রমিকদের অবস্থা আরো খারাপের দিকে। যদি কাজ না থাকে তাহলে বেতন কীভাবে দেয়া হবে, সেটি নিয়ে আমরা চিন্তিত বলে মতামত দেন ব্যবসায়ীরা।

জাহাজ ভাঙা মালিকদের সংগঠন বিএসবিআরএর সিনিয়র সহসভাপতি এবং ব্যবসায়ী মো. কামাল উদ্দিন আহমদ বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারের এলসি-সংক্রান্ত নির্দেশনায় শিথিলতা না আসা পর্যন্ত আমাদের স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানিতে জটিলতা থেকেই যাচ্ছে। আমরা যে এলসি খুলছি তাতে ছোট সাইজের স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করতে হচ্ছে। এতে করে ইয়ার্ডগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। দেশে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি যদি আরো কমে যায়, তাহলে ইয়ার্ডগুলোতে শ্রমিকদের কাজ থাকবে না বলে জানান তিনি। এভাবে চলতে থাকলে সবগুলো ইয়ার্ড বন্ধ রাখা ছাড়া উপায় থাকবে না।

এদিকে শ্রমিকরা বলছেন, গত কয়েক মাসে শিপ ইয়ার্ডগুলোতে কাজ হ্রাস পেয়েছে ব্যাপক হারে। আগে এক ইয়ার্ডে কাজ শেষ করে আমরা অন্য ইয়ার্ডে কাজের জন্য শিফটিং হয়ে যেতাম। এখন ইয়ার্ডগুলোতে তেমন কোনো কাজ নেই। যে কয়েকটি ইয়ার্ডে নামমাত্র কাজ চলছে সেখানে শ্রমিকরা কাজের জন্য হাহাকার শুরু করে দিয়েছে। দেশের এ শিল্প খাতের শ্রমিকদের জন্য সরকারের আলাদা বেতন কাঠামো (পে স্কেল) থাকলেও মালিকপক্ষের সদিচ্ছার কারণে এখনো সেটা বাস্তবায়ন করা হয়নি। অন্যদিকে মালিকপক্ষ এ বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন না করার জন্য ঠিকাদারি প্রথার মাধ্যমে শ্রমিকদের কাজ করাতে আগ্রহী। এসব কারণে দেশের এ শিল্প খাতটিতে দুর্দিন নেমে এলেও সব থেকে বেশি ভুক্তভোগী হয়েছেন শ্রমিকরা। জাহাজ ভাঙা শিল্পের শ্রমিকদের জন্য ২০০৯ সালে প্রণীত স্বতন্ত্র মজুরি কাঠামো প্রণয়নের পর ২০১৮ সালে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করে আদেশ জারি করে। চারটি গ্রেডে দক্ষ (দুটি গ্রেড), আধা দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য মজুরি নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। আইন অনুযায়ী প্রতিটি ইয়ার্ডের নিজস্ব শ্রমিক থাকার কথা থাকলেও জাহাজের মালিকরা এ নিয়মের বিকল্প পথে হাঁটছেন। শ্রমিকদের স্থায়ী না করার কারণে জাহাজ আমদানির পর তা চুক্তিভিত্তিক ঠিকাদারের হাতে তুলে দিচ্ছে মালিকপক্ষ।

এ প্রসঙ্গে জাহাজ ভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত বণিক বার্তাকে বলেন, মালিকরা তাদের বিভিন্ন কাজে প্রণোদনা কিংবা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেলেও শ্রমিকরা এ খাতে বঞ্চিত হচ্ছেন। এখন ইয়ার্ডগুলোতে কাজ কমে যাওয়ায় বেশির ভাগ শ্রমিক এখন মানবেতর জীবনযাপন করত। দেশের শিল্পগুলোর মধ্যে এ জাহাজ ভাঙা শিল্পটি সব থেকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।