গত শতকের শেষের দিকে প্রযুক্তির বিস্তার শুরু হলেও তা সর্বোচ্চ গতি পেয়েছে চলতি শতকে। একুশ শতকের প্রথম দুই দশকে প্রযুক্তির ব্যবহার প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের নজরও এখন প্রযুক্তি খাতে। বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো এখন প্রযুক্তি কোম্পানিতেই অর্থ লগ্নিতে বেশি আগ্রহী। এ কথা যেমন প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তেমনি প্রযোজ্য পরোক্ষ বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও। শেয়ারবাজারে একটা সময় তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলোয় বিনিয়োগের জোয়ার থাকলেও এখন সে স্থান দখল করছে জৈব প্রযুক্তি কোম্পানি।
ওয়াল স্ট্রিটে সাম্প্রতিক সময়ে জৈব প্রযুক্তি স্টার্টআপের আইপিও শেয়ারের চাহিদা অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে, বায়োফার্মাসিউটিক্যাল ও বায়োমেডিসিন কোম্পানিগুলো এখন বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে। এসব খাতের স্টার্টআপে বিনিয়োগ করে ভালো রিটার্নও পাওয়া যাচ্ছে।
আইপিও সবসময়ই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্য আরাধ্য। তবে এতে ঝুঁকিও রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আইপিও প্রক্রিয়ায় থাকা নতুন কোম্পানি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায় না। আবার যা পাওয়া যায়, তাতেও কারসাজির আশঙ্কা থেকেই যায়। মাঝেমধ্যে অবলেখকরা ইচ্ছাকৃতভাবে কোম্পানির বাজারমূল্য ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বেশি দেখান, যেন তার শেয়ারদর বেশি হয়। এ ধরনের কোম্পানির আইপিও শেয়ার কিনে বিনিয়োগকারীদের রীতিমতো মাথায় হাত পড়ার উপক্রম হয়। তবে সব আইপিও শেয়ারই যে খারাপ, তা নয়। ভালো আইপিও বাছাই করে বিনিয়োগ করতে পারলে সেখান থেকে ভালো রিটার্ন পাওয়া যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে যেসব আইপিও শেয়ার বিনিয়োগকারীদের ভালো রিটার্ন দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে জৈব প্রযুক্তি কোম্পানিই বেশি। গত বছর রিটার্নের ভিত্তিতে শীর্ষ ১০ আইপিও শেয়ারের নয়টিই এ খাতের। বাকি শেয়ারটি বীমা খাতের। এসব কোম্পানির বেশির ভাগই স্বল্প বাজার মূলধনি কোম্পানি। তাই ভবিষ্যতে কোম্পানিগুলো সম্প্রসারণের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। রিটার্নের দিক থেকে ২০১৯ সালের সেরা ১০টি আইপিও শেয়ারের তালিকা তৈরি করেছে মোটলি ফুল। এক্ষেত্রে লেনদেন শুরুর পর থেকে গত বছরের ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত শেয়ারদরকে বিবেচনায় নিয়ে রিটার্ন হিসাব করা হয়েছে।
১. কারুনা থেরাপিউটিকস
২০১৯ সালের সেরা আইপিও শেয়ার এটি। নাসডাক স্টক এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত কোম্পানিটির বর্তমান বাজার মূলধন ২১০ কোটি ডলার। বোস্টনভিত্তিক ক্লিনিক্যাল স্টেজ বায়োফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিটির অবলিখিত শেয়ারদর ছিল ১৬ ডলার। প্রথম দিনের ওপেনিং প্রাইস ছিল ১৮ ডলার ৫০ সেন্ট। সেই শেয়ারটিই গত বছরের ২০ ডিসেম্বর ৮১ ডলার ৭১ সেন্টে লেনদেন হয়েছে। অর্থাত্ কোম্পানিটির আইপিও শেয়ার থেকে ৩৪১ দশমিক ৬৮ শতাংশ রিটার্ন পেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
২. নেক্সটকিওর
জৈব প্রযুক্তি কোম্পানির বিনিয়োগকারীদের কাছে মেরিল্যান্ডভিত্তিক কোম্পানি নেক্সটকিওর পরিচিত একটি নাম। ১২৪ কোটি ডলার বাজার মূলধনের কোম্পানিটি গত বছরের মে মাসে শেয়ারবাজারে আসে। শেয়ারটির অবলিখিত দর ছিল ১৫ ডলার। প্রথম দিন লেনদেন শুরু হয় ১৫ ডলার ৫৫ সেন্টে। ২০ ডিসেম্বর শেয়ারটি হাতবদল হয় ৫৮ ডলার ৫৫ সেন্টে।
রিটার্নের হার ২৭৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
৩. অ্যাপ্লায়েড থেরাপিউটিকস
শেয়ারটির যাত্রার শুরুটা খুব একটা ভালো ছিল না। অবলেখকরা এর দর নির্ধারণ করেছিলেন ১০ ডলার। কিন্তু প্রথম দিনের ওপেনিং প্রাইস ছিল এর চেয়ে কম— ৮ ডলার ৪ সেন্ট। কিন্তু শেয়ারটির প্রতি যারা বিশ্বাস রেখেছিলেন, তাদের কিন্তু হতাশ হতে হয়নি। ধৈর্যশীল বিনিয়োগকারীরা পরবর্তীতে ২০৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ মুনাফা পকেটে পুরতে পেরেছিলেন। ২০ ডিসেম্বর শেয়ারটি হাতবদল হয় ২৪ ডলার ৭২ সেন্টে।
মার্কিন জৈব প্রযুক্তি কোম্পানি অ্যাপ্লায়েড থেরাপিউটিকসের শেয়ার লেনদেন শুরু হয় গত বছরের মে মাসে। বর্তমানে এর বাজার মূলধন ১১৫ কোটি ডলার।
৪. ইনমোড
রিটার্নের দিক থেকে ইসরায়েলভিত্তিক মেডিকেল টেকনোলজি কোম্পানিটি অ্যাপ্লায়েড থেরাপিউটিকসের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে ভগ্নাংশ ব্যবধানে। শেয়ারটির অবলিখিত দর ছিল ১৪ ডলার। প্রথম দিন লেনদেন শুরু হয় ১৩ ডলার ৫০ সেন্টে। ২০ ডিসেম্বর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ ডলার ৫০ সেন্ট। মাত্র চার মাসে শেয়ারটি বিনিয়োগকারীদের ২০৭ দশমিক ৪১ শতাংশ রিটার্ন দিয়েছে। নাসডাকে তালিকাভুক্ত ইনমোডের বর্তমান বাজার মূলধন ১৩৭ কোটি ডলার।
৫. পালোমার হোল্ডিংস
গত বছর রিটার্নের দিক থেকে শীর্ষ ১০ আইপিও কোম্পানির মধ্যে জৈব প্রযুক্তি খাতের বাইরে একমাত্র কোম্পানি এটি। কোম্পানিটি সর্বনাশা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি প্রশমনে বীমা সুবিধা প্রদান করে। ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক কোম্পানিটির বর্তমান বাজার মূলধন ১৩১ কোটি ডলার। আইপিও শেয়ারের অবলিখিত দর ছিল ১৫ ডলার। প্রথম দিনের ওপেনিং প্রাইস ছিল ১৮ ডলার ৫০ সেন্ট। ২০ ডিসেম্বর শেয়ারটির দর বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির হার ২০০ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।
৬. টার্নিং পয়েন্ট থেরাপিউটিকস
শেয়ারটির অবলিখিত দর ছিল ১৮ ডলার। ওপেনিং প্রাইস ছিল ২৪ ডলার ২৫ সেন্ট। লেনদেনের প্রথম দিনেই শেয়ারটির দর ৩৫ শতাংশ বেড়ে যায়। ২০ ডিসেম্বর দর দাঁড়ায় ৬৩ ডলার ২৫ সেন্ট। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের ১৬০ দশমিক ৮২ শতাংশ রিটার্ন দিয়েছে শেয়ারটি।
গত বছরের এপ্রিলে পুঁজিবাজারে আসা কোম্পানিটি নাসডাকে নিবন্ধিত। বর্তমানে এর বাজার মূলধন ২২৭ কোটি ডলার।
৭. অ্যাপ্রি থেরাপিউটিকস
পুঁজিবাজারে কোম্পানিটির যাত্রা গত বছরের অক্টোবরে। মাত্র দুই মাসেই শেয়ারটি বিনিয়োগকারীদের ১৩১ দশমিক ৬৯ শতাংশ রিটার্ন দিয়েছে। শেয়ারটির অবলিখিত দর ছিল ১৫ ডলার। ওপেনিং প্রাইস ছিল ১৫ ডলার ৪৬ সেন্ট। ২০ ডিসেম্বর দর দাঁড়ায় ৩৫ ডলার ৮২ সেন্ট।
বোস্টনভিত্তিক জৈব প্রযুক্তি কোম্পানিটি নভেল ক্যান্সার থেরাপি নিয়ে কাজ করে। বর্তমানে কোম্পানিটির বাজার মূলধন ৭৩ কোটি ৭৩ লাখ ডলার।
৮. আরএপিটি থেরাপিউটিকস
এ কোম্পানিরও শেয়ারবাজারে যাত্রা গত বছরের অক্টোবরে। ১২ ডলার অবলিখিত দরের শেয়ারটি প্রথম দিনের শুরুতে লেনদেন হয় ১২ ডলার ২৫ সেন্টে। ২০ ডিসেম্বর এ দর বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ ডলার ৪২ সেন্ট। অর্থাৎ দুই মাসের ব্যবধানে শেয়ারটি থেকে ১২৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ মুনাফা অর্জন করেছেন বিনিয়োগকারীরা। কোম্পানিটির ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক কোম্পানিটি নাসডাকে নিবন্ধিত। বর্তমানে এর বাজার মূলধন ৬৫ কোটি ৫১ লাখ ডলার।
৯. বায়োএনটেক
মেসেঞ্জার আরএনএ (এমআরএনএ) নিয়ে কাজ করা জৈব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটির পুঁজিবাজারে যাত্রা গত অক্টোবরে। বর্তমানে এর বাজার মূলধন ৭০৩ কোটি ডলার। শেয়ারটির অবলিখিত দর ছিল ১৬ ডলার। প্রথম দিনের ওপেনিং প্রাইস ছিল ১৬ ডলার ৫০ সেন্ট। ২০ ডিসেম্বর দর বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ ডলার ৯৭ সেন্ট। দুই মাসে বিনিয়োগকারীদের ১১১ দশমিক ৯৪ শতাংশ রিটার্ন দিয়েছে শেয়ারটি।
১০. অ্যাভেড্রো
শেয়ারপ্রতি ১৪ ডলার অবলিখিত দর নিয়ে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে পুঁজিবাজারে আসে অ্যাভেড্রো। কিন্তু প্রথম দিনের ওপেনিং প্রাইস ছিল ১১ ডলার ৬০ সেন্ট। তবে সে সময় শেয়ারটিতে বিনিয়োগকারীরা পরবর্তীতে লাভবান হন, যখন ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক মেডিকেল টেকনোলজি ও ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি গ্লুকোস কোম্পানিটিকে কিনে নেয়। ২০ ডিসেম্বর কোম্পানিটির শেয়ারদর দাঁড়ায় ২২ ডলার ৯৯ সেন্ট। অর্থাৎ এক বছরের কম সময়ের ব্যবধানে শেয়ারটি থেকে প্রায় শতভাগ মুনাফা অর্জন করেছেন বিনিয়োগকারীরা।










