আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ প্রক্রিয়ায় প্রতি বছরই নিয়ম করে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তাব চাওয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে আজ চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সঙ্গে বৈঠক করবে এনবিআর। তবে দেশের প্রথম সারির ব্যবসায়ী ও ভারী শিল্প খাতের উদ্যোক্তাদের এ সংগঠনটির নেতারা বলছেন, প্রতি বছর বাজেটের আগে একটা নিয়ম করে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করা হয়। কিন্তু তাদের প্রস্তাব কিংবা সুপারিশ নেয়া হলেও সেটা বাস্তবায়নের চিত্র বেশ হতাশাজনক। এজন্য এবারের প্রাক-বাজেট আলোচনায় উত্থাপন করা সুপারিশ বাস্তবায়ন করার দাবি তাদের।
জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, উদ্যোক্তারা কিন্তু বাস্তবতার নিরিখেই তাদের প্রস্তাবগুলো দিয়ে থাকে। আমরা চাইব আমাদের এ আলোচনাগুলো কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ কিংবা শুধুই নিয়ম রক্ষার খাতিরে যেন না হয়।
আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ থেকে ১৪টি মূলনীতি ধরে বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, শিল্প উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা প্রদান ও নতুন শিল্প স্থাপনে উৎসাহিত করা, পণ্য বহুমুখীকরণসহ রফতানি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যকে প্রাধান্য দেয়া, বন্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প-কারখানা পুনরায় চালু করা, শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য আমদানি নির্বিঘ্ন করা ও সাপ্লাই চেইন অক্ষুণ্ন রাখা, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়া, কর ব্যবস্থাপনা আরো বেশি ব্যবসাবান্ধব ও জনবান্ধব করা, পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা, মহামারীজনিত ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া বেগবান করা, অভ্যন্তরীণ সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং শিল্পায়নের ক্ষেত্রে অর্থ প্রবাহ বৃদ্ধিসহ সংশ্লিষ্ট নীতিমালা সহজীকরণ করা। এছাড়াও বৃহত্তর চট্টগ্রামে গভীর সমুদ্রবন্দর, মহেশখালী পাওয়ার হাব, বঙ্গবন্ধু টানেল, বে-টার্মিনাল, বিমানবন্দর এক্সপ্রেসওয়ে, মিরসরাইতে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর ইত্যাদি মেগাপ্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আসন্ন বাজেটে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ রাখার সুপারিশ রয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বারের প্রস্তাবে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, অতিমারী পরিস্থিতিতে গত দুই বছর ব্যবসা-বাণিজ্য অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকোপ অনেকটা কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মোটামুটি পুরোদমে চালু হয়েছে। তাই আগামী বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ থেকে প্রস্তাবে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু মূলনীতি প্রাধান্য পেয়েছে। আগামীকাল (আজ) এনবিআরের সঙ্গে অনুষ্ঠিতব্য মতবিনিময় সভায় এসব তুলে ধরা হবে। আসন্ন বাজেটে আমাদের তথা ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হলে অর্থনীতিকে কভিড পূর্বাবস্থায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলে দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করি।
আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট উপলক্ষে চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ থেকে শুল্ক সংক্রান্ত ৭০, ভ্যাট সংক্রান্ত ২২ এবং আয়কর সংক্রান্ত ১০২টি প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ভারী শিল্প খাতে লৌহ ও লৌহজাত পণ্য এবং সিমেন্ট সেক্টরে উৎসে কর কর্তনের হার ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশে নামিয়ে আনা, আমদানি পর্যায়ে স্ক্র্যাপের টনপ্রতি ৫০০ থেকে কমিয়ে ১০০ টাকায় হ্রাস করা এবং চূড়ান্ত নিষ্পত্তি থেকে অব্যাহতি দেয়া, এলপি গ্যাস শিল্পে বিক্রয় পর্যায়ে বিক্রীত মূল্যের ওপর আরোপিত ৭ শতাংশ হারে ভ্যাট বাদ দিয়ে এর পরিবর্তে আমদানি পর্যায়ে প্রতি কেজি ২ টাকা ট্যারিফ ভ্যাটের প্রবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ ইয়ার্ডগুলোকে গ্রিন ইয়ার্ড করার প্রয়োজনে আমদানিতে মূলধনি যন্ত্রপাতি শতভাগ শুল্কমুক্ত রাখার প্রস্তাবও করা হয়।
বিএসআরএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমীর আলীহুসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা যে কথাগুলো বলতে চাই কিংবা বলে আসছি সেটা বাস্তবায়নে না গেলে এর কোনো মানে হয় না। কর আদায়ের পরিসর বাড়ানোসহ আমরা কিছু নির্দিষ্ট এরিয়া অ্যাড্রেস করে করহার কমানোর কথা বলছি। কিন্তু সেটির পদক্ষেপ নেই। এর আগেও যুক্তিসংগত এমন কিছু সুপারিশ বাজেটে বিবেচিত না হওয়ায় আশাহত হয়েছি। কোনো কোম্পানি শতভাগ কমপ্লায়েন্স হয়ে প্রতিযোগিতায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। কারণ একই ব্যবসা পরিচালনায় অনেকে ভ্যাট না দিয়ে ম্যানেজ করে চালিয়ে নিচ্ছে। রাজস্ব আদায়ের একটা বিশাল লক্ষ্য কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটি অধিক মনোযোগ পায় এনবিআরের কাছে। অথচ এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, উদ্যোক্তাদের কথা অনুধাবন করতে পারলে রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম অধিকতর অর্থবহ হবে।
প্রিমিয়ার সিমেন্ট লিমিটেড ও সি-কম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, এমন প্রস্তাব দিয়েও অপেক্ষায় থাকতে হয়, যেগুলো সরাসরি ভবিষ্যতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমাদের সুপারিশ যদি ন্যায়সংগত ও যুক্তিসংগত হয়, তাহলে বিষয়গুলো সমাধানের উদ্যোগ নেবেন, এটাই তো আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, যতগুলো বিষয় অ্যাড্রেস করে কথা বলেছি কোনোটিরই সুফল পাইনি।
অতিমারী কিংবা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আমদানি শুল্ক যৌক্তিকীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হলে অর্থনৈতিক কাঠামো সুদৃঢ় হবে বলে মনে করেন কেএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার জাহান রাহাত। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য অর্জনে যেমন এনবিআরের সক্রিয়তা থাকে, তেমনি কর কাঠামো যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ হবে এমনটাই আমরা আশা করি।
টি কে গ্রুপের ডিরেক্টর মোহাম্মদ মুস্তাফা হায়দার বণিক বার্তাকে বলেন, করপোরেট করহার কমানোসহ বিভিন্ন দাবি থাকে ব্যবসায়ীদের। এর মধ্যে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য সহায়ক প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথ সহজ হবে।
এ বিষয়ে এনবিআর সদস্য মাসুদ সাদিক বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যবসায়িক সংগঠনও শতভাগ বাস্তবায়নের উপযুক্ত প্রস্তাব কিংবা সুপারিশ করে না। এর অনেক কিছুই বিবেচনায় নেয়ার উপযুক্ততা থাকে না। তবে দেশের উৎপাদনমুখী শিল্পের জন্য কিংবা যৌক্তিক প্রস্তাব ঠিকই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়।










