আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে সরকারের রাজস্ব সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পণ্যের যাচাইকরণ। আমদানি-সংশ্লিষ্ট দলিলাদির ক্ষেত্রে প্রোফর্মা ইনভয়েস, এলসি, ই-এলসির তথ্য (মূল্য, পরিমাণ), কমার্শিয়াল
ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করতে হয়। বন্ড সুবিধায় আমদানি হওয়া পণ্যের ক্ষেত্রে দেখতে হয় বন্ড লাইসেন্স পণ্যের অন্তর্ভুক্তি ও প্রাপ্যতার পরিমাণ, ইউডি, জেনারেল বন্ড, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রত্যয়নপত্র বা অনাপত্তিপত্র। যদিও পণ্যের ছাড়করণের এ প্রক্রিয়ায় প্রতিটি বিল অব এন্ট্রির সঙ্গে সংযুক্ত দলিলাদির সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষে। আবার প্রায়ই সরেজমিনে পণ্য না দেখে অনুমোদন দিয়ে দেয়ায় ঘটছে ভুয়া রফতানির মতো জালিয়াতির ঘটনাও। নথি কিংবা পণ্য যাচাই প্রক্রিয়ায় এ ধরনের সীমাবদ্ধতা রাজস্ব সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি হওয়া পণ্য বন্দরের অভ্যন্তরে ছাড়াও ১৭টি অফডকে রাখা হয়। প্রতিটি অফডকেই আমদানি-রফতানি সংশ্লিষ্ট নথি কিংবা পণ্যের পরীক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে একটি অফডকের উদাহরণ দেয়া যাক। সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেডের (এসএপিএল) অধীনে চট্টগ্রামের দুটি ডিপোতে প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে এক হাজার পেপারে শুল্কায়ন হচ্ছে। এ বিশাল কর্মযজ্ঞ সামাল দিতে রাজস্ব কর্মকর্তা তিনজন। আর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন মাত্র পাঁচজন। যদিও শুল্কায়ন কার্যক্রমে যুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, বেসরকারি এ অফডকে কমপক্ষে ৩০ জন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) এবং পাঁচজনের বেশি রাজস্ব কর্মকর্তার (আরও) উপস্থিতি প্রয়োজন। এমনিতে সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গেলে একজন এআরওর পক্ষে প্রতিদিন ২০টির বেশি ডকুমেন্ট যাচাই করা সম্ভব নয়। এর চেয়ে যত বেশিসংখ্যক নথি যাচাই করা হবে, ততই বাড়বে রাজস্ব ঝুঁকি। বেসরকারি অফডকগুলোর মতো একই পরিস্থিতি বিদ্যমান ইপিজেডে কাস্টমস শুল্কায়নের ক্ষেত্রেও।
আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে সম্প্রতি একের পর এক জালিয়াতির ঘটনায় গঠিত হয়েছে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি। পণ্যচালান খালাস প্রক্রিয়ায় আমদানি-আইপি জালিয়াতি চিহ্নিত করতে চট্টগ্রাম কাস্টমসের গঠিত একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও পণ্য যাচাইয়ে সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে। কমিটির সদস্যরা আমদানি ও রফতানি পণ্য চালানের শুল্কায়ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আওতায় নজরদারির পরিপ্রেক্ষিতে সরেজমিনে দেখতে পান, চট্টগ্রাম কাস্টমসের আওতাধীন চট্টগ্রাম ইপিজেড (সিইপিজেড) ডিভিশনে প্রতিদিন গড়ে ৬০০ আগামপত্র (বিল অব এন্ট্রি) শুল্কায়ন কার্যক্রম (পরীক্ষণ, শুল্কায়ন, স্কর্টিং) সম্পন্ন হয়। এ-সংক্রান্ত রি-রাউটিংকারী এক থেকে দুজন রাজস্ব কর্মকর্তার পক্ষে প্রতিটি চালানের বিপরীতে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে প্রবেশ করে আইজিএম যাচাই এবং বেপজার ওয়েবসাইটে আইপি যাচাই করে পণ্যচালান শুল্কায়ন করা সময়সাপেক্ষ। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পক্ষে সঠিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব কিনা, তা প্রশ্নের দাবি রাখে বলে উল্লেখ করা হয় খোদ কাস্টমস তদন্ত কমিটির ওই প্রতিবেদনে।
যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মো. ফখরুল আলম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, পণ্যের সঠিকতা যাচাই করতে একজন কর্মকর্তা একদিনে কতগুলো নথি যাচাই করতে পারবেন, সেটা নির্ভর করে তার দক্ষতার ওপর। এক্ষেত্রে সব অফিসারের দক্ষতা একরকম হয় না। তাই দায়িত্ব দেয়া হলেও কোনো কর্মকর্তা যদি চাপ সামলানোর ব্যাপারে শঙ্কিত হন, সেক্ষেত্রে আগেই লিখিতভাবে জানানো উচিত। সেক্ষেত্রে অবশ্যই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ রয়েছে। কোনো পণ্যের চালানে জালিয়াতি শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, সিঅ্যান্ডএফ ছাড়াও কাস্টমস কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা কিংবা অবহেলা রয়েছে কিনা, সেটিও তত্ক্ষণাৎ তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়।
কাস্টমসের তথ্যমতে, পণ্যের কায়িক পরীক্ষা সম্পর্কিত একটি স্থায়ী আদেশে বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া চালানগুলোর অনধিক ১০ শতাংশ কায়িক পরীক্ষা করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতে পরীক্ষার জন্য চালান নির্বাচনে কম্পিউটারের সাহায্যে দৈবচয়ন (র্যানডম সিলেকশন) পদ্ধতি অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত চালানের মধ্যে কনটেইনারজাত পণ্যের ক্ষেত্রে অনধিক ১০ শতাংশ কনটেইনার খোলা হবে। এসব কনটেইনারের পণ্য শতভাগ কায়িক পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা দেয়া আছে। এছাড়া কনটেইনারে আনা হয়নি এমন পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে পরীক্ষাধীন চালানের অনধিক ১০ শতাংশ পণ্য পুরোপুরি পরীক্ষা করা হবে। দৈবচয়নের ভিত্তিতে পরীক্ষার জন্য কনটেইনার প্যাকেজ নির্বাচিত করা হবে।
নাম না প্রকাশের শর্তে একাধিক রাজস্ব কর্মকর্তা জানান, এক কর্মকর্তার বিপরীতে এত চালান যাচাইয়ের দায়িত্ব থাকে যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সরেজমিনে দেখা অসম্ভব। এতে করে এক প্রতিষ্ঠানের বিআইএন (ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর) ব্যবহার করে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান চালান খালাস করে নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আবার রফতানির ক্ষেত্রে পণ্য রফতানি না করেই রফতানি দেখিয়ে নগদ সহায়তার টাকা উঠিয়ে নিচ্ছেন প্রতারকরা। কম হারের কিংবা নগদ সহায়তার আওতা-বহির্ভূত পণ্য রফতানি করে বেশি হারের পণ্য দেখাচ্ছেন। আবার একই পণ্য কম রফতানি করে বেশি দেখিয়েও নগদ সহায়তার অর্থ লোপাট হচ্ছে। সবজি, খাদ্যদ্রব্য ও মসলাজাতীয় পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে সম্প্রতি এ ধরনের বেশকিছু জালিয়াতিও ধরা পড়ছে চট্টগ্রাম কাস্টমসের তত্পরতায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় রফতানি পণ্যের চালান খুলে কনটেইনারের সামনের দিকে ঘোষণা অনুযায়ী খাদ্যপণ্য রেখে দেয়া হয়। অথচ ভেতরটা একেবারে ফাঁকা। নথিপত্রে ১ লাখ ডলারের খাদ্যপণ্য রফতানির কথা বলা হলেও পণ্য পাওয়া যায় মাত্র ৫ হাজার ডলারের। এ ধরনের কারসাজি রোধ করতে পণ্য চালান পরীক্ষায় আরো সতর্ক হতে কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। একই সঙ্গে বন্দরের বাইরে অফডকে পণ্য চালানের সংখ্যা ও অফডক কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা তথ্য যাচাই করার নির্দেশনাও দেয়া হয়।
বন্দর ব্যবহারকারী ফোরাম ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রাম কাস্টমস দেশের সবচেয়ে বড় রাজস্ব আহরণকারী সংস্থা। অথচ এখানে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কমসংখ্যক লোক কাজ করছেন। যার ফলে ফালতু নামে বহিরাগতদের এ রকম স্পর্শকাতর জায়গায় সম্পৃক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দ্রুত পণ্য খালাস করতে চান। এজন্য শতভাগ সততা নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরই। এক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে কালক্ষেপণ করলে চলবে না। এতে আমদানিকারকের আর্থিক ক্ষতিসহ কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রমে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়।










