জমি বিক্রি বাবদ খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের ৩৩২ কোটি টাকা পরিশোধ করছে না নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড (নওপাজেকো)। পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে একাধিকবার ও খুলনা নিউজপ্রিন্ট কর্তৃপক্ষ ৩২ বার চিঠি পাঠিয়েও নওপাজেকোর জবাব মেলেনি। এদিকে নিউজপ্রিন্ট মিলের কাছে ঋণ বাবদ ৩২২ কোটি ৮০ লাখ টাকা পায় সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ঋণ পরিশোধ না করায় এ ঋণের হার ক্রমাগত বাড়ছে। এ নিয়ে বিপাকে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র অনুযায়ী, বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের অব্যবহৃত ৫০ একর জায়গা কিনে নেয় নওপাজেকো। ঋণ নেয়া বাবদ সোনালী ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ থাকলেও বিসিআইসির মধ্যস্থতায় এ জমি বিক্রি করা হয়। জমি বিক্রির টাকা দিয়ে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের কথা ছিল খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের। ক্রয়কৃত ৫০ একর জমিতে ‘রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্র’ প্রকল্প গ্রহণ করে নওপাজেকো। বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রি, হস্তান্তর ও অপসারণে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এ জমি বিক্রি করা হয়। এমনকি ব্যাংকের পক্ষ থেকে স্থাপনা, ভবন বিক্রির টেন্ডার-সংক্রান্ত কার্যক্রম স্থগিতের জন্য বিসিআইসি ও মিল কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হলেও তা আমলে নেয়নি কর্তৃপক্ষ।
বিসিআইসির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, ১৯৯৮ সালে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার পর তা পরিশোধের আর সুযোগ হয়নি মিলটির। ফলে দিনের পর দিন ওই ঋণের সুদ বেড়ে যাচ্ছিল। মূলত দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ পড়ে থাকা মিলের ঋণ পরিশোধ করতে এ বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রির উদ্যোগ নেয়া হয়। করপোরেশনের ধারণা ছিল ৫০০ কোটি টাকা পেলে তার মধ্যে মিলের ৩৭৮ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করবে। বাকি টাকা দিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম চালানো হবে। কিন্তু সমঝোতা চুক্তির সাড়ে চার বছর হয়ে গেলেও নওপাজেকো অর্থ পরিশোধ না করায় আবারো দেনার মধ্যে পড়তে হবে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলকে। বার বার চিঠি দেয়ার পরও নওপাজেকোর সাড়া না মেলায় এখন বিসিআইসি চেয়ারম্যান বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব বরাবর চিঠি ইস্যু করবেন।
নওপাজেকোর তথ্য মতে, মিলের অর্থ পরিশোধ না করলেও নওপাজেকোর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কার্যক্রম চলছে দ্রুতগতিতে। প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৬১ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ২৯ শতাংশ। আগামী বছরের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বিদ্যুতের প্রথম ইউনিট এবং ২০২৫ সালের মার্চে দ্বিতীয় ইউনিট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে কোম্পানিটির। কোম্পানিটি কার্যক্রম শুরু করলেও এখনো দেনার দায় নিয়ে আছে কাগজ কারখানাটি।
অর্থ পরিশোধ না করার বিষয়ে নওপাজেকোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. খোরশেদুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের ডিপিপিতে যে অর্থ বরাদ্দ ছিল, তা আমরা চুক্তি স্বাক্ষরের আগে দিয়ে দিয়েছি। কিন্তু বাকি অর্থের সংস্থান আমাদের কোম্পানিতে নেই। সরকার অনুমোদন করলে তবে আমরা এ অর্থ খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলকে দিতে পারব। তা নাহলে আমাদের দেয়ার সুযোগ নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘সোনালী ব্যাংক যে টাকা পাবে তা সুদ হিসেবে পাবে। আমরা সোনালী ব্যাংককে অনুরোধ করেছি খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের সুদ মওকুফের জন্য। কিন্তু সোনালী ব্যাংক সুদ মওকুফ করছে না। তারা (মিল কর্তৃপক্ষ) অনুরোধ করুক।’
বর্তমানে নিউজপ্রিন্ট মিলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) দায়িত্বে আছেন শেখ আরিফুজ্জামান। অর্থ পরিশোধের বিষয়ে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘টাকা আদায়ের জন্য আমরা প্রতি মাসে চিঠি ইস্যু করছি। গতকালও (মঙ্গলবার) আমাদের ৩২তম চিঠি ইস্যু করেছি। কিন্তু এসব চিঠির কোনো জবাব আমরা পাচ্ছি না। আমরা আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
সোনালী ব্যাংক খুলনা করপোরেট শাখা সূত্রে জানা যায়, নিউজপ্রিন্ট মিল চালু থাকা অবস্থায় কাঁচামাল সংগ্রহ করতে সোনালী ব্যাংক করপোরেট শাখা থেকে ১৯৯৮ সালে মিলের ৮৮ দশমিক ৬৭৫ একর জমি বন্ধক রেখে ৫৭ কোটি টাকা ঋণ নেয়, যা ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনারোপিত সুদসহ ৩৭৮ কোটি ৭৬ লাখ ২ হাজার ৬০২ টাকায় দাঁড়ায়। এর মধ্যে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর নিউজপ্রিন্ট মিল কর্তৃপক্ষ ৫৫ কোটি ৯৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা বকেয়া পরিশোধ করে। ঋণ পরিশোধের পর ৩২২ কোটি ৮০ লাখ ৮৬ হাজার ৬০২ টাকা বকেয়া পাওনা থাকে সোনালী ব্যাংকে। সে হিসেবে খুলনায় সোনালী ব্যাংকের সবচেয়ে বড় ঋণ খেলাপি নিউজপ্রিন্ট মিল।
দীর্ঘদিনের খেলাপি হওয়ায় খুলনা নিউজপ্রিন্টের ঋণটি অবলোপন করা হয়েছে বলে জানান সোনালী ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) শেখ আল মামুন। তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহৎ এ ব্যাংকটির খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘খুলনা নিউজপ্রিন্টের ঋণটি বহু পুরনো। সরকারি হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ঋণ আদায়ে মামলা করা যায়নি। এ কারণে সোনালী ব্যাংক ঋণটি অবলোপন করেছে। ২০১৮ সালে খুলনা নিউজপ্রিন্ট কিছু টাকা পরিশোধ করেছিল। ঋণের পরিমাণ যা-ই হোক না কেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা ঋণটি পরিশোধের উদ্যোগ নিলে কিছু সুদ মওকুফ করে হলেও বিষয়টি নিষ্পত্তির সুযোগ আছে। এক্ষেত্রে খুলনা নিউজপ্রিন্টকেই এগিয়ে আসতে হবে।’










