কভিড-১৯ সংক্রমণের সময়ও দেশে ভোজ্যতেলের দাম ছিল স্থিতিশীল। বিশ্ববাজারে পণ্যটির দাম কম থাকায় দেশের বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েনি। তবে কঠোর লকডাউন পরিস্থিতি শিথিল হয়ে এলে বিশ্ববাজারে দাম বাড়তে শুরু করে ভোজ্যতেলের। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে ভোজ্যতেলের বৈশ্বিক বাজার লাগামহীন হয়ে পড়ে। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ভোজ্যতেলের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সম্প্রতি ভোজ্যতেলের দাম ২০২০ সালের দামে ফিরলেও দেশের বাজারে এর প্রভাব নেই।
বিশ্বব্যাংকের পিংক শিট প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২০ সালে অপরিশোধিত পাম অয়েলের দাম ছিল টনপ্রতি ৭৫২ ডলার। ২০২১ সালে দাম বেড়ে গড়ে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ১৩১ ডলারে। ২০২২ সালে পাম অয়েলের দাম গড়ে উঠে যায় ১ হাজার ২৭৬ ডলারে। সর্বশেষ মে মাসে টনপ্রতি কয়েকশ ডলার কমে ১ হাজার ডলারের নিচে নেমে যায় পাম অয়েলের দাম।
জানুয়ারিতে টনপ্রতি দাম ছিল ৯৪২ ডলার, ফেব্রুয়ারিতে ৯৫০, মার্চে ৯৭২, এপ্রিলে ১ হাজার ৫, মে মাসে ৯৩৪ ও সর্বশেষ ১৮ জুন পাম অয়েলের বুকিং দর ছিল ৮০২ ডলার ২৫ সেন্ট।
অন্যদিকে ২০২০ সালে অপরিশোধিত সয়াবিনের টনপ্রতি দাম ছিল ৮৩৮ ডলার, যা ২০২১ সালে বাড়তে শুরু করে। বছরব্যাপী সয়াবিনের টনপ্রতি গড় দাম ছিল ১ হাজার ৩৮৫ ডলার। ২০২২ সালে দাম ছিল ১ হাজার ৬৬৭ ডলার। চলতি বছরের শুরুতেই পণ্যটির দাম কমতে শুরু করে। জানুয়ারিতে সয়াবিনের টনপ্রতি দাম কমে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৩৫২ ডলারে, ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ২৪৩, মার্চে ১ হাজার ১১৩, এপ্রিলে ১ হাজার ৩০ ডলার এবং মে মাসে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত সয়াবিনের গড় দাম ছিল ৯৮৮ ডলার, যা ২০২০ সালের তুলনায় ১৫০ ডলার কম।
বিশ্ববাজারে ২০২০ সালের দামের কাছাকাছি নামলেও দেশে ভোজ্যতেলের দামে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি। ২০২০ ও ২০২১ সালে দেশে ভোজ্যতেলের মধ্যে বোতলজাত সয়াবিনের লিটারপ্রতি খুচরা দাম ছিল ১০৪ টাকা। পলিথিন মোড়কে লিটারপ্রতি দাম ছিল ৯২-৯৫ টাকা। যদিও সর্বশেষ ১১ জুন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ট্যারিফ কমিশনের সমন্বয়ে দেশে ভোজ্যতেলের মধ্যে সয়াবিনের সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করা হয় ১৮৯ টাকা (বোতলজাত)। এছাড়া পাম অয়েলের লিটারপ্রতি দাম ১০ টাকা কমিয়ে ১৬৭ টাকা করা হয়। এর আগে গত ৩ মে বোতলজাত সয়াবিনের দাম লিটারপ্রতি ১২ টাকা বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা করেছিল কোম্পানিগুলো।
পাইকারি বাজার ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববাজারে যে হারে ভোজ্যতেলের দাম কমেছে, সে হারে দেশের বাজারে কমেনি। ২০২০ কিংবা ২০২১ সালের দামের সঙ্গে সমন্বয় করতে হলে সয়াবিনের দাম ১২০-১২৫ টাকার মধ্যে থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমদানিকারক ও মোড়কজাতকারী কোম্পানিগুলো দাম কমিয়েছে লিটারে মাত্র ১০ টাকা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কিংবা ট্যারিফ কমিশনের মাধ্যমে অনুমোদন নিয়ে আমদানিকারক কোম্পানিগুলো ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে অতিমুনাফা করছে বলে অভিযোগ তাদের।
দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের এসও (সাবেক ডিও) বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম এক বছর আগের চেয়ে অর্ধেকে নেমে এসেছে। ভোজ্যতেল আমদানি করলে বিদ্যমান দামের চেয়ে অর্ধেকে বিক্রি করা যায়। কিন্তু কোনো ধরনের যাচাই ছাড়াই কোম্পানিগুলো ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করেছে।’ এতে আমদানিকারকরা বড় ধরনের মুনাফা করলেও সাধারণ ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা ঠকছেন বলে মনে করছেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম যেভাবে কমছে দেশের বাজারে সেভাবে কমছে না।’ মূলত পড়তি বাজারে দাম কমানোর ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রতা দেখিয়ে আমদানিকারক কোম্পানিগুলো নিত্যপণ্যটি থেকে অতিমুনাফা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে আমদানিকারকদের দাবি, বিশ্ববাজারে দাম যেভাবে কমছে, সে হারেই ধারাবাহিকভাবে কমানো হচ্ছে। বিশ্ববাজারের তথ্য, এলসি (ঋণপত্র) তথ্য, এক্স বন্ড ও আউটবন্ড তথ্য পর্যালোচনার পাশাপাশি উৎপাদন খরচসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই শেষে দাম নির্ধারণ করা হয়। ১১ জুন দাম কমানোর ফলে ঈদের আগে দাম সমন্বয়ের কোনো চিন্তা নেই। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চাইলে ঈদের পর ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয় হতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দেশের শীর্ষস্থানীয় ভোজ্যতেল আমদানি, পরিশোধন ও বিপণন প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের পরিচালক (করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স) বিশ্বজিৎ সাহা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভোজ্যতেলের দাম বিশ্ববাজারে ধারাবাহিকভাবে কমছে, এটা ঠিক। আমদানিকারকরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত দামেই পণ্য বিক্রি করেন। ১১ জুন নতুন দাম নির্ধারণের পর আপাতত দাম সমন্বয়ের সুযোগ নেই।’










