সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না করায় সাভারের চামড়া শিল্পনগরী বন্ধ করে দেয়ার সুপারিশ করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। তবে চামড়া শিল্পের উন্নয়নে সুপারিশ প্রদান ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে গঠিত টাস্কফোর্স বলছে, শিল্পনগরী বন্ধ করে দেয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। বিপরীতে শিল্পনগরীর সমস্যাগুলোর সমাধানে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে জোর দেয় টাস্কফোর্স। চামড়া শিল্পের বিকাশকে সুসংহত এবং টেকসই করতে ‘চামড়া শিল্প ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ’
গঠনের পাশাপাশি সাভার ট্যানারি শিল্প এলাকার কার্যক্রম সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা পদায়নসহ বেশকিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে টাস্কফোর্স।
‘চামড়া শিল্প খাতের উন্নয়নে সুপারিশ প্রদান ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন টাস্কফোর্স’-এর আহ্বায়ক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের সভাপতিত্বে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সভায় এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সভায় টাস্কফোর্সের সদস্য বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান মো. মোশতাক হাসান এনডিসিসহ অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সভার কার্যপত্র সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সাভারের চামড়া শিল্পনগরী বন্ধে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশ প্রসঙ্গে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেন, ট্যানারি শিল্প বন্ধ করার মতো পরিস্থিতি এখনো হয়নি। তবে বহির্বিশ্বে চামড়া শিল্পের বাজার ধরে রাখতে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের অনুকূলে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সার্টিফিকেট অর্জনসহ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণে তিনি সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানান। ব্যক্তিগত লাভ-লোকসান বিবেচনা না করে চামড়া শিল্পের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণে ট্যানারি মালিকদের আহ্বান জানান মন্ত্রী।
সভায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ট্যানারিগুলোর অতিরিক্ত পানি ব্যবহারের ফলে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপির কার্যক্ষমতা ব্যাহত হয়। তবে সাভার ট্যানারি শিল্পনগরী বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়। বরং চামড়া শিল্পনগরীর বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে জোর দিতে হবে। চামড়ার সঠিক ব্যবস্থাপনা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কাঁচা চামড়া যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। সভায় শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি স্টোরেজ নির্মাণের পাশাপাশি সিইটিপি’ও মেডিউলগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা, ইসিআর-৯৭-এর মানদণ্ড অনুযায়ী পানি ব্যবহার নিশ্চিত, বিসিক আইন অনুযায়ী ট্যানারি শিল্প এলাকায় জব ওয়ার্ক নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
সভায় চামড়া শিল্পের বিকাশকে সুসংহত এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ ও টেকসইকরণে ‘চামড়া শিল্প ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ’
গঠনেরও সিদ্ধান্ত হয়। সভার গৃহীত অন্যান্য সিদ্ধান্ত হচ্ছে—সাভার ট্যানারি শিল্প এলাকার কার্যকর সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা পদায়ন। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ইফ্রুয়েন্ট যাতে সিইটিপিতে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য ইফ্রুয়েন্ট ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম চালু। ট্যানারি শিল্পের কঠিন বর্জ্য পরিবেশসম্মতভাবে সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার জন্য স্থায়ী ও গ্রিন ডাম্পিং ইয়ার্ড স্থাপন। ট্যানারিগুলোর উৎপাদন ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিইটিপি’ও ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি। শিল্পনগরীর রাস্তার দুই পাশে চামড়ার আড়ত না বসিয়ে পরিকল্পিতভাবে চামড়ার আড়ত স্থাপনের ব্যবস্থা গ্রহণ।
সভায় শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার বলেন, সংসদীয় কমিটি সাভার ট্যানারি বন্ধ করে দেয়ার সুপারিশ করেছে, তা মোটেই যুক্তিযুক্ত হয়নি। ট্যানারি শিল্প বন্ধ না করে বরং কী কারণে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সাভার ও ধামরাই এলাকায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান রঙ, কেমিক্যাল সরাসরি নদীতে ফেলছে এবং এসব এলাকার নদীর পানি প্রচুর দুর্গন্ধময় হয়ে উঠছে—এসব সরেজমিন পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।
অতিমাত্রায় পানি ব্যবহারের ফলে কেমিক্যাল ওয়েস্টের মাধ্যমে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে, তাই ট্যানারি শিল্প বন্ধের সুপারিশ এসেছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন। তবে কী কারণে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে তা চিহ্নিত করে এ থেকে উত্তরণের পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধও জানান তিনি।
এদিকে গত ২৩ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকে সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না করায় সাভারের চামড়া শিল্পনগরী বন্ধ করে দেয়ার সুপারিশ আসে। সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে, সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে দৈনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ২৫ হাজার ঘনমিটার। অথচ সেখানে এখন রোজ ৪০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য উৎপাদন হয়। অর্থাৎ দৈনিক ১৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য পরিবেশে মিশছে। সব মিলিয়ে গত তিন বছরে ১ কোটি ৬৪ লাখ ঘনমিটার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে গেছে, যা পরিবেশ দূষিত করেছে। সাভারে শুধু তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা যায়। হেভি মেটাল ও ক্রোমিয়াম বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো ব্যবস্থাই সেখানে নেই।










