এক দশক ধরেই দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। এতে করে আমদানি ও রফতানির ক্রমবর্ধমান যে বৈদেশিক বাণিজ্যের চাপ, সেটি প্রায় এককভাবেই বহন করছে চট্টগ্রাম বন্দর। সরকারিভাবে ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী সামনের বছরগুলোয় দেশে ধারাবাহিক এবং জোরালো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে। সমুদ্রপথে বাড়তে থাকবে পণ্য পরিবহন। স্বাভাবিকভাবেই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল রেখে অর্থনীতির লাইফলাইনটিতে বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়ন নিশ্চিত ছাড়া বিকল্প পথ খোলা নেই। যদিও বর্তমানে কর্তৃপক্ষের হাতে থাকা প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের যে অগ্রগতি তাতে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়ার অপেক্ষা শুধু দীর্ঘ হওয়ারই ইঙ্গিত মেলে।
সমুদ্রপথে আগামীর বৈদেশিক বাণিজ্যের চাপ সামাল দিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে নির্মাণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি), মাতারবাড়ী
বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প ও বে টার্মিনাল প্রকল্প। এর মধ্যে পিসিটির যে সক্ষমতা এবং বিলম্বে বাস্তবায়ন হওয়ায় এ টার্মিনাল চালু হলে খুব অল্প সময়ের জন্যই হ্যান্ডলিং চাপ সামাল দেয়া যাবে। অন্যদিকে মাতারবাড়ী বন্দর থেকে পণ্য খালাসের সুবিধা পেতে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের অপেক্ষা করতে হবে কমপক্ষে আরো চার বছর। চট্টগ্রাম বন্দরের পরিকল্পনায় থাকা অন্য প্রকল্পটি হলো বে টার্মিনাল। চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত এ প্রকল্পটি নৌ-মন্ত্রণালয়ের নির্মাণ অনুমতি পাওয়ার আট বছর পার হয়েছে, অথচ এখনো কমন ইউজ ফ্যাসিলিটিজই নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে প্রয়োজনের সময় জেটির অপ্রতুলতা চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে বিরাট প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দেবে দেশের ব্যবসায়ীদের কাছে।
অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে তাল রেখে চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্যোগ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কতটা ভারসাম্য থাকবে, সেটির ধারাবাহিক বিশ্লেষণ করেছে বণিক বার্তা। এতে দেখা যায়, আগামীতে বন্দর সম্প্রসারণের পদক্ষেপ হিসেবে সবার আগে অর্থাৎ চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে অপারেশনে আসবে পিসিটি। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে চালুর লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও প্রকল্পের কাজ পিছিয়েছে দুই দফা। টার্মিনালটি চালু হলে মাত্র চার লাখ একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে। ২০১৭ সালের ১৩ জুন সরকারের পক্ষ থেকে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পের অনুমোদন পেলেও সময়মতো উদ্যোগটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রবৃদ্ধির হার বিবেচনায় এ সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে মাত্র এক থেকে দেড় বছর অর্থাৎ ২০২৩ সাল পর্যন্ত সামাল দিতে পারবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। পিসিটিতে থাকবে তিনটি কনটেইনার জেটি ও একটি তেল খালাসের ডলফিন জেটি। পরিচালন কার্যক্রম শুরু হলে পিসিটির মাধ্যমে গত প্রায় ১৪ বছরে চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্যোগে নতুন কোনো সমুদ্রগামী জেটি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন ব্যবসায়ীরা।
বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা বলছেন, পিসিটি বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ ও সীমিত সক্ষমতার কারণে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম সামলাতে হিমশিম খাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। কারণ এরপর প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় ব্যবসায়ীদের জন্য বন্দর সেবায় যুক্ত হবে ‘মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প’। তবে চট্টগ্রাম বন্দরের আওতাধীন মাতারবাড়ী বন্দরের প্রথম পর্যায়ের কার্যক্রমই শেষ হবে ২০২৬ সালে। নির্মাণ সম্পন্ন হলে ১৮ মিটারের বেশি গভীরতার জাহাজ ভিড়তে পারবে কক্সবাজার জেলার মহেষখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে। কয়লা ও তেল খালাসের দুটি জেটিতে এখন শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সরঞ্জাম আনা হচ্ছে। সড়ক সংযোগ চালু হলে ২০২৬ সাল থেকে ব্যবসায়ীরা এ টার্মিনালের সুফল নিতে পারবেন ৮ লাখ টিইউস সক্ষমতার মাতারবাড়ী বন্দর থেকে। প্রবৃদ্ধির বিবেচনায় এ সক্ষমতা দিয়ে চাপ সামলানো যাবে ২০২৭ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত।
এরপর আর একটি মাত্র প্রকল্প থাকে চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত বে টার্মিনাল প্রকল্প। এছাড়া অন্য কোনো প্রকল্প নেই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে। বে টার্মিনাল থেকে বহির্নোঙরের দূরত্ব মাত্র এক কিলোমিটার। বিদ্যমান চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে এর পরিধি প্রায় পাঁচ গুণ হবে, যেখানে ১৪ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ানোর সুবিধা পাওয়া যাবে। পণ্য পরিবহনের চাপ সামলাতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০১২ সালে বে টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় এবং নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে ২০১৪ সালে এর অনুমতিও মেলে। আগেকার পরিকল্পনা অনুযায়ী এ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে গেলে চলতি বছর ২০২১ সালেই প্রথম ধাপে বে টার্মিনালে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। অথচ বন্দর কর্তৃপক্ষ বে টার্মিনাল প্রকল্প নিয়ে বছরের পর বছর আশার কথা শোনালেও অনুমতি পাওয়ার গত আট বছরেও এ টার্মিনালের জন্য কমন ইউজ ফ্যাসিলিটিজ হিসেবে ‘ব্রেক ওয়াটার’
নির্মাণ করতে পারেনি বন্দর কর্তৃপক্ষ।
মোটা দাগে বে টার্মিনালের জন্য অপর প্রয়োজনটি হবে ব্রেকআপ ইয়ার্ড। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত এজন্য মাত্র ৬৯ একর ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি বুঝে পেয়েছে। বাকি ৮০০ একর খাস জমি গত তিন বছর বহু দেনদরবার করেও নানা জটিলতায় নিজের আয়ত্তে আনতে পারেনি। বেশির ভাগ জমি পাওয়ার চ্যালেঞ্জ বন্দর কর্তৃপক্ষ কতটা উতরে উঠতে পারবে এখন সেটাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া পণ্যর ওঠানামায় বে টার্মিনালে নির্মাণ করতে হবে জেটি।
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদীয় কমিটির কাছে একটি প্রতিবেদনে বন্দর কর্তৃপক্ষ সবার আগে জেটির অপ্রতুলতার বিষয়টি তুলে ধরেছে। এ সমস্যার সমাধানে পিসিটি আর মাতারবাড়ী বন্দরের পাশাপাশি বে টার্মিনালের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়েছে।
নাম না প্রকাশের শর্তে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের বন্দরের সঙ্গে সম্পর্কিত এমন একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বে টার্মিনালে কার্যক্রম শুরুর একেবারে প্রথম পর্যায়েই সাগরে বাঁধ দিয়ে নির্মাণ করতে হবে ব্রেক ওয়াটার। এ ব্রেক ওয়াটার নির্মাণে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক কিংবা অন্য কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে ফান্ড নিশ্চয়তা পাওয়ার পর আজ থেকে কাজ শুরু করলেও সময় লাগবে কমপক্ষে দুই বছর। অপরদিকে বাকি ৮০০ একর জমি বুঝে পাওয়া সাপেক্ষে ব্রেকআপ ইয়ার্ড তৈরি ও জেটি নির্মাণসহ শুধু নির্মাণযজ্ঞেই কমপক্ষে সাত থেকে আট বছর সময় লাগার কথা। আবার বন্দরের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে টার্মিনালের অন্যান্য কাজ শেষে এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ করাটাও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের অধীনে চলমান পিসিটি ও মাতারবাড়ী বন্দরের পর বৈদেশিক বাণিজ্যের চাপ কীভাবে সামাল দেবে বন্দর কর্তৃপক্ষ তা এখনো অনিশ্চিত একটি বিষয়।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শাহজাহান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে তাল রেখে বন্দর সম্প্রসারণে আমাদের হাতে তিনটি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরই পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে অপারেশন শুরু করে দেয়া যাবে। এর পরের ধাপে চট্টগ্রাম বন্দরের অধীনে মাতারবাড়ী বন্দরের সুবিধা পেতে আমদানি-রফতানিতে যুক্ত ব্যবসায়ীদের ২০২৬ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এ সময়ের ভেতর মাতারবাড়ীর সঙ্গে সংযোগ সড়কের কাজও দ্রুত এগিয়ে যাবে।’
বে টার্মিনাল প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, বে টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়নে আমরা সর্বোচ্চ কাজ করে যাচ্ছি। ব্রেক ওয়াটারে অর্থায়নের ব্যাপারে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক নিজের মতো করে পরিকল্পনা দেয়ায় আমরা তাতে রাজি হইনি। এর কার্যক্রম চলছে। এছাড়া ইয়ার্ড তৈরির জন্য বাকি ৮০০ একর জমি বুঝে পেতেও কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
দেশের শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে টানেল তৈরির উদ্যোগের পর দক্ষিণ চট্টগ্রামে বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন উদ্যোক্তারা। ফলে শিল্প খাতে কাঁচামাল আমদানি ও রফতানির জন্য কনটেইনার পরিবহন অব্যাহতভাবে বাড়বে।
বন্দর ব্যবহারকারী ফোরাম ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা চাপ তৈরি করবে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর। একটি প্রকল্প পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ভবিষ্যৎ বন্দর হিসেবে বে টার্মিনালকে বার বার সামনে দেখানো হলেও এর ন্যূনতম অগ্রগতিও দৃশ্যমান হচ্ছে না। বে টার্মিনাল প্রকল্প নির্মাণে যদি দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হতো, তাহলে বন্দর সুবিধা নিয়ে আগামী ৫০ বছরও ভাবতে হতো না।










