করোনার পর আন্তর্জাতিক অভিবাসন প্রবাহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা এখন ঊর্ধ্বমুখী। ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে প্রায় দ্বিগুণ কর্মী বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। ১৯৭৬ সালের পর থেকে সবচেয়ে বেশি কর্মী অভিবাসন হয়েছিল গত বছরে। তবে অভিবাসন বাড়লেও ২০২১ সালের তুলনায় দক্ষ কর্মী পাঠানোর হার কমেছে। বেড়েছে অদক্ষ কর্মীর সংখ্যা। কমেছে রেমিট্যান্স প্রবাহ।  

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ৬ লাখ ১৭ হাজার ২০৯ জন বাংলাদেশী কর্মী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিয়েছেন। তার পরের বছর ২০২২ সালে মোট ১১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৭৩ জন পাড়ি দেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।  

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ‌‘‌বাংলাদেশ থেকে শ্রম অভিবাসনের গতিপ্রকৃতি ২০২২’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে দক্ষ কর্মী অভিবাসনের সংখ্যা ২০২১ সালের তুলনায় কমেছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে ২২ দশমিক ৩৩ শতাংশ দক্ষ কর্মী অভিবাসন হয়েছিল। কিন্তু ২০২২ সালে তা ১৭ দশমিক ৭৬ শতাংশে নেমেছে। তবে অর্ধদক্ষ কর্মী অভিবাসন সংখ্যার তেমন পরিবর্তন হয়নি। ২০২২ সালে ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ অর্ধদক্ষ কর্মী অভিবাসন হয়েছে। ২০২১ সালে তা ছিল ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ। প্রতি বছরের মতো ২০২২ সালেও অদক্ষ কর্মী পাঠানোর হার বেড়েছে। ২০২২ সালের ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অদক্ষ কর্মীর অভিবাসনের হার ছিল ৭৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২১ সালে ছিল ৭৫ দশমিক ২৪ শতাংশ।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, চারটি শ্রেণীতে বিভক্ত বাংলাদেশী অভিবাসীদের মধ্যে পেশাদার কর্মীদের হার কম। তবে ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে তা সামান্য বেড়েছে। ২০২১ সালে শূন্য দশমিক ১৪ শতাংশ পেশাজীবী কর্মী অভিবাসন করেন। তবে ২০২২ সালের ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ পেশাজীবীর কর্মী অভিবাসন হয়েছে। 

রামরু চেয়ার অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌আমাদের দক্ষ অভিবাসী পাঠানোর সংখ্যা বাড়াতে হবে। আমরা বারবার বলে এসেছি এখানে একটি অসংগতি রয়েছে। এটি এমন নয় যে দক্ষ লোক বাংলাদেশে নেই। যে ভিসাগুলো দেশে আসে, ওই দেশে থাকা মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যক্তিগতভাবে যারা পাঠায় সেগুলো সব অদক্ষ ক্যাটাগরির ভিসা। এখানে প্রতারণা করার সম্ভাবনা বেশি। সেজন্য তারা এসব ভিসা বেশি নিয়ে আসেন। পেশাদার বা দক্ষ কর্মীদের জন্য ভিসা আনতে হলে যে ধরনের দক্ষতা, যোগ্যতা বা কাজ করা দরকার সেটা রিক্রুটিং এজেন্সি করছে না। আমরা দক্ষ কর্মী পাঠাতে পারছি না। কারণ রিক্রুটিং এজেন্সির আগ্রহ যে ভিসাগুলো সহজে পাওয়া যায় সেগুলোয়। ফলে দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মী পাঠানো যাচ্ছে না। সরকারও রিক্রুটিং এজেন্সির ওপর জোর প্রয়োগ করে না। সরকার যদি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কোটা দিয়ে দিত তাহলে এ সমস্যাগুলো সমাধান হতো। তারাও চ্যালেঞ্জ নিয়ে দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মী পাঠাতে আগ্রহী হয়ে উঠত।’ 

দক্ষ কর্মী পাঠানোর সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক মো. শহীদুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌এবার বিদেশে কর্মীর যাওয়ার সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো নিয়মিত কর্মীর সঙ্গে প্রত্যাগত কর্মীও যুক্ত হয়েছে। করোনাকালীন প্রত্যাগত প্রায় তিন-চার লাখ কর্মী ছিল, যারা করোনার পর ২০২২ সালে বিদেশে কাজে ফিরে গেছেন। যারা ছিল অদক্ষ কর্মী। দ্বিতীয়ত, ট্রেনিং সেন্টারগুলো দুই বছর ধরে বন্ধ ছিল। এতদিন বন্ধ থাকলে দক্ষ কর্মী স্বাভাভিকভাবেই পাওয়া যাবে না। আরেকটি কারণ হলো দক্ষতা কর্মী পাঠানোর ওপর নির্ভর করে না। নিয়োগকারীরা কেমন কর্মী চাচ্ছেন তার ওপরও দক্ষ কর্মী নির্ভর করে। বিষয়টি এমন নয় যে আমরা দক্ষ কর্মী বসিয়ে রেখে অদক্ষ কর্মী পাঠাচ্ছি। চাহিদা যেভাবে আসে সেভাবেই বিদেশে কর্মী যায়।’