পাইকারি বাজারে অস্বাভাবিক বেড়েছে এলাচের দাম। দেশে চলমান ডলার সংকটের কারণে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে জটিলতার মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এতে আমদানি কমে যাওয়ায় অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে মসলাপণ্যটির বাজার। পাশাপাশি হাতবদল হওয়ায় মধ্যস্বত্বভাগীদের দৌরাত্ম্যেও এক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মেয়াদের ভিত্তিতে বাজারে এখন দুই ধরনের এলাচের লেনদেন হচ্ছে। ২০২২-২৬ সাল পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে এমন এলাচ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকার মধ্যে। অন্যদিকে ২০২৩-২৭ সাল পর্যন্ত ব্যবহারোপযোগী এলাচ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২৫০ টাকায়। ২০২৭ সাল মেয়াদি এলাচ খুচরা পর্যায়ে সরবরাহ করা না হলেও ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) ট্রেডিংয়ের কারণে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে পণ্যটির। এতে এক শ্রেণীর ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান কোটি কোটি টাকা আয় করলেও একপর্যায়ে দাম কমে বড় লোকসানের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে পাইকারি বাজারে।
দেশে বিক্রি হওয়া ভোগ্যপণ্যের ৪০-৫০ শতাংশই লেনদেন হয় খাতুনগঞ্জে। তবে বিশেষ বিশেষ ভোগ্যপণ্য আমদানিকারকরা ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে খুচরা বাজারে সরবরাহ করে থাকে। ট্রেডিং বাণিজ্যে সরাসরি পণ্য বুঝে নেয়ার পরিবর্তে ডিও লেটার বা স্লিপের (সরবরাহ আদেশনামা) মাধ্যমে লেনদেন করা হয়। স্লিপের মালিকানার মাধ্যমেই পণ্যের মালিকানা বিবেচনা করা হয়। একটি নির্দিষ্ট সময় পর বাজারদর অনুসারে পণ্যটির লাভ-লোকসান হিসাব করা হয়। ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান থেকে স্লিপ ক্রয় করে কৃত্রিমভাবে লেনদেনের মাধ্যমে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এলাচের বাজার নিয়ে এ ধরনের লেনদেন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
মসলা ব্যবসায়ীরা বলছেন, এলাচের কেজিপ্রতি স্বাভাবিক বাজার দর ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। কয়েক মাস আগে এলাচের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। পরে দাম কমে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় নেমে এলেও বর্তমানে ফের বাড়তে শুরু করেছে।
খাতুনগঞ্জের মসলা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এলাচের দুই ক্যাটাগরির লেনদেন পদ্ধতি পণ্যটির দাম বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। ২০২২ সালে উৎপাদিত ও ২০২৬ সাল পর্যন্ত ব্যবহারের মেয়াদ রয়েছে এমন এলাচের দাম তুলনামূলক কম। অন্যদিকে ২০২৩ সালের উৎপাদিত ও ২০২৭ সাল পর্যন্ত মেয়াদ থাকা এলাচ বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। দুই ধরনের এলাচের গুণগত মানের কোনো পার্থক্য না থাকলেও পদ্ধতিটির কারণে পণ্যটির দাম পারস্পরিক লেনদেনের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জের মেসার্স সায়মা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলাচের বাজার খুবই ছোট। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এলাচের বাজার স্বাভাবিক থাকলেও একটি নির্দিষ্ট সময় পর পণ্যটির বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।’ বাজারে লেনদেন হওয়া এলাচ খুচরা পর্যায়ে সরবরাহ না হলেও পারস্পরিক লেনদেনের মাধ্যমে এর দাম বাড়ছে বলে মনে করছেন তিনি।
খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক মাস আগেও প্রতি কেজি এলাচের (২০২৭ সাল পর্যন্ত মেয়াদি) সর্বোচ্চ দর উঠেছিল ২ হাজার ৪৫০ টাকায়। নভেম্বরের শুরুতে একই মানের এলাচের দাম নেমে এসেছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৭৫০ টাকায়। অন্যদিকে ২০২৬ সালের মেয়াদ থাকা এলাচের বুকিং দর বা স্লিপ মূল্য উঠেছিল ১ হাজার ৯৫০ থেকে ২ হাজার টাকায়। নভেম্বরের শুরুতে এ এলাচের দাম কমে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫৫০ টাকায় নেমে গেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেডিং ব্যবসায়ীরা সক্রিয় হওয়ায় এলাচের বাজার আবারো চাঙ্গা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করে খাতুনগঞ্জের এক ডিও ব্যবসায়ী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়েক বছর আগে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি এলাচের দাম ৪ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। ওই সময় আমদানি সংকট, বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে কৃত্রিমভাবে এলাচের দাম বাড়ানো হয়েছিল। বর্তমানেও বিশ্ববাজারে এলাচের দাম বৃদ্ধি ও সংকটের কথা বলে এলাচে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে দামও বাড়ানো হচ্ছে।’ অপ্রচলিত পণ্য হওয়ায় প্রশাসনের নজর কম থাকার কারণে সহজেই দাম বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে গরম মসলার মধ্যে জনপ্রিয় এলাচের বার্ষিক চাহিদা প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টন। প্রতি বছর বিশ্ববাজার থেকে চার হাজার টনের মতো এলাচ আমদানি হয়। কয়েক বছর ধরে এলাচের পাইকারি বাজার কেজিপ্রতি ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগীর আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিয়মিত পণ্যগুলোর লেনদেন কমে গেলে কিংবা লোকসান হলে অপ্রচলিত পণ্যের লেনদেনে ঝুঁকে পড়েন ব্যবসায়ীরা। সাম্প্রতিক সময়ে ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন পণ্যের বাজার মন্দার কারণে সবাই এলাচে বিনিয়োগ করেছে।’
মসলা ব্যবসায়ীরা বলছেন, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে গুয়েতেমালা ও ভারতে নতুন মৌসুমের এলাচ উত্তোলন শুরু হয়েছে। ফলে বর্তমানে বিশ্ববাজারেও পণ্যটির বাজার স্থিতিশীলতায় ফিরবে। কিন্তু দেশে ডলার সংকটের কারণে অতি প্রয়োজনীয় নয় এমন পণ্য আমদানি সীমিত হয়ে এসেছে। সরবরাহ কমার এ সংকটকে দাম বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছেন অনেকে।










