ব্যাপক অনিয়ম, প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের অদক্ষতা ও ভর্তুকি দামে চিনি বিক্রি করায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) গত পাঁচ বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা লোকসান গুনেছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন ব্যয়সহ সব ধরনের কার্যক্রম চালানো দুরূহ হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় সরকারের বাজেটের অর্থ থেকেই চলছে এসব কার্যক্রম। এসব ব্যয় মেটাতে এক বছরে ৪৬০ কোটি টাকার চাহিদার কথা জানিয়েছে বিএসএফআইসি কর্তৃপক্ষ। চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে ২০০ কোটি টাকার ছাড় করেছে অর্থ মন্ত্রণায়ের অর্থ বিভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে বিএসএফআইসি নিয়ন্ত্রণাধীন চলমান নয়টি চিনিকলের অনুকূলে শ্রমিক-কর্মচারীদের চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বকেয়া বেতন-ভাতাসহ চিনি উৎপাদনসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয় নির্বাহের মাধ্যমে চিনিকলগুলো সচল রাখার জন্য ‘পরিচালন ঋণ’ হিসেবে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ৬ এপ্রিল অর্থ বিভাগের সংশোধিত বাজেটের ‘পরিচালন ঋণ’ খাত হতে বেশকিছু শর্তে এ বরাদ্দ দেয়া হয়।

শর্তগুলো হলো, এ বরাদ্দকে নজির হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। বরাদ্দকৃত অর্থ সংশ্লিষ্ট খাত ব্যতীত অন্য কোনো খাতে ব্যয় করা যাবে না। এ অর্থ বিএসএফআইসির নিরীক্ষিত ভর্তুকি ও ট্রেডগ্যাপের সঙ্গে সমন্বয়যোগ্য হবে। অর্থ ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম দিয়ে নিরীক্ষা করে তার রিপোর্ট আগামী তিন মাসের মধ্যে অর্থ বিভাগে পাঠাতে হবে।

শর্তের মধ্যে আরো রয়েছে, এ পর্যন্ত বিএসএফআইসির অনুকূলে প্রদত্ত রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির বিপরীতে প্রদেয় ঋণ যথাসময়ে পরিশোধ করতে হবে এবং এ-সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিতভাবে অর্থ বিভাগকে জানাতে হবে। বরাদ্দকৃত অর্থ বিএসএফআইসির অনুকূলে ‘পরিচালন ঋণ’ হিসেবে গণ্য হবে, যা পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ আগামী ২০ বছরে ৫ শতাংশ সুদে ষাণ্মাসিক কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে। এজন্য অর্থ বিভাগের সঙ্গে বিএসএফআইসিকে একটি ঋণচুক্তি করতে হবে। এছাড়া বরাদ্দকৃত অর্থে জিও (সরকারি আদেশ) জারি করে এর দুই কপি পৃষ্ঠাঙ্কনের জন্য অর্থ বিভাগে পাঠাতে হবে।

এর আগে গত ১৪ ডিসেম্বর বিএসএফআইসির চিনিকলের অনুকূলে ২০২০-২১ অর্থবছরে আখচাষীদের আখের মূল্য পরিশোধ বাবদ ‘পরিচালন ঋণ’ হিসেবে শর্ত সাপেক্ষে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। ওই বরাদ্দপত্রে বলা হয়, শিল্প মন্ত্রণালয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিএসএফআইসির চিনিকলের অনুকূলে আখচাষীদের শুধু আখের মূল্য পরিশোধ বাবদ ২০২০-২১ অর্থবছরের অর্থ বিভাগের বাজেটে ‘পরিচালন ঋণ’ খাত হতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ১০০ কোটি টাকা শর্ত সাপেক্ষে বরাদ্দ দেয়া হলো। এক্ষেত্রে একই ধরনের শর্ত দেয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান মো. আরিফুর রহমান অপু বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের তো অনেক দেনা রয়েছে। অবস্থা ভালো নয়। কারণ আখ থেকে চিনি উৎপাদনের খরচ হয় ২৮০ টাকা। অথচ সে চিনি বাজারে বিক্রি করা হয় ৬০ টাকায়। এতে করে চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের বড় ধরনের ক্ষতি হয়। তাই এক বছরে বিভিন্ন পরিচালন ব্যয় মেটানোর জন্য আমরা ৪৬০ কোটি টাকা চেয়েছিলাম। এ টাকা দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী অনুমোদনও করেছেন। তারই অংশ হিসেবে দুই দফায় ২০০ কোটি টাকা ছাড় করেছে অর্থ বিভাগ।

প্রতিষ্ঠানের লোকসান কমানোর কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ চেষ্টা আমরা প্রতিনিয়তই চালিয়ে যাচ্ছি। তবে এটা লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। আর এ প্রতিষ্ঠান থেকে লাভ আসবে—এটা ভেবে এটি প্রতিষ্ঠাও করা হয়নি। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কিছু চুরি-চামারিসহ অনিয়ম তো হয়। যদি ভালো প্রশাসন আসে, তাহলে সেগুলো দূর করা যাবে। তাছাড়া দুর্নীতি বা অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে আমরা সব সময় কাজ করে যাচ্ছি।

এদিকে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে বিএসএফআইসির আয় হয়েছে ৩ হাজার ১৪৭ কোটি ২২ লাখ টাকা। আর ব্যয় হয়েছে ৭ হাজার ৮৬ কোটি ২ লাখ টাকা। লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৩৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ সুগার মিলস করপোরেশনকে বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনে পরিণত করা হয়। চিনি উৎপাদন বাড়ানো এবং উপজাতভিত্তিক পণ্য উৎপাদন এ করপোরেশনের লক্ষ্য। এই করপোরেশনের অধীনে ১৫টি চিনিকল পরিচালিত হয়। তবে লোকসানের কারণে সম্প্রতি ছয়টি চিনিকল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

বিএসএফআইসি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৫২৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬৩৯ কোটি ৪৪ লাখ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৮৩৩ কোটি ৫১ লাখ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১ হাজার ৬ কোটি ৪৯ লাখ, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৯৩৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে।

প্রতিবেদনে বিএসএফআইসির লোকসানের আটটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো চিনির উৎপাদন খরচের চেয়ে বিক্রয় মূল্য কম হওয়া, বিশ্বব্যাপী চিনির দাম কমে যাওয়া, পুঞ্জীভূত ঋণ ও সুদের পরিমাণ অনেক বেশি হওয়া, অধিক চিনিসমৃদ্ধ পোকা ও রোগবালাই প্রতিরোধ সক্ষম আখের জাত উদ্ভাবন না হওয়া, কারখানাগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়া, বেসরকারি খাতে আমদানীকৃত ‘র’ সুগার থেকে রিফাইন্ড সুগার উৎপাদন করে কম মূল্যে বাজারজাত হওয়া, ব্যাংকঋণের সুদ বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং চিনি সংগ্রহের হার কমে যাওয়া।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে উদ্দেশ্যে সরকারি কোম্পানি গঠন করা হয়েছিল, তা সফল হয়নি। কারণ লোকসান বৃদ্ধির অর্থ হলো বাজার প্রতিযোগিতায় বেসরকারি কোম্পানির তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে এসব কোম্পানি। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ বাড়ছে। অর্থাৎ মুদ্রা ও পুঁজি উভয়বাজারে সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট ভেঙে দিয়ে ঢেলে সাজানো উচিত। তা না হলে পরিস্থিতি উন্নতি হবে না।