বাংলাদেশ থেকে কয়েক বছর ধরে ইউরোপের দেশগুলোতে আম রফতানি হচ্ছে। বিদেশের বাজারে চাহিদা রয়েছে দেশের সতেজ সবজিসহ অন্যান্য কৃষিপণ্যেরও। কিন্তু এসব পণ্যের গুণগতমানের কারণে অনেক সময় বাজার ধরতে হিমশিম খেতে হয় ব্যবসায়ীদের। আবার অনেক সময় পণ্যে পোকামাকড়, রোগবালাই কিংবা জীবাণুর উপস্থিতি থাকে। এসব কারণেও বিভিন্ন সময় রফতানি চালান বাতিল হয়। সেজন্য আম ও সবজিসহ উৎপাদিত কৃষিপণ্যের মান বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। এজন্য পণ্য পরিশোধনে সংস্থাটি বাষ্প তাপ প্রয়োগ প্লান্ট বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ-সংক্রান্ত একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

জানা গেছে, বিএডিসির এ প্রকল্পের নাম ‘আম ও অন্যান্য সতেজ কৃষিপণ্যের রফতানি বৃদ্ধিতে বাষ্প তাপ প্রয়োগ প্লান্ট স্থাপন।’ প্রস্তাবিত প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৮৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে রাজধানীর গাবতলীতে ২ হাজার ৫০০ বর্গমিটার আয়তনের জায়গা নিয়ে এ বাষ্প তাপ প্রয়োগ প্লান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্লান্টে দৈনিক ৬০ টন সতেজ কৃষিপণ্য পরিশোধনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া বছরে ১০ হাজার টন আম এ প্লান্টের মাধ্যমে পরিশোধন করা হবে। মূলত আমের মৌসুমে ফলটির রফতানি উপযোগী ও মান বাড়ানোর জন্য এ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বছরের বাকি সময়ে প্রায় ২৫ হাজার টন সবজি এ প্লান্টের মাধ্যমে পরিশোধন ও রোগজীবাণু মুক্তকরণ হবে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সতেজ কৃষিপণ্য মোড়কজাত করার জন্য একটি অটো কনভেয়ার প্যাকেজিং লাইন নির্মাণ করা হবে। ফলে রফতানিযোগ্য কৃষি পণ্যের বাজারজাতকরণ ব্যবস্থারও উন্নয়ন ঘটবে। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এ প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফল ও সবজিতে প্রাকৃতিকভাবেই কিছু ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া, শূককীট এবং বিভিন্ন পোকামাকড়ের ডিম থাকে। বাষ্প তাপ প্রয়োগ প্লান্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া এবং এদের ডিম ধ্বংস করা হবে। এছাড়া এ প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে এসব সতেজ কৃষিপণ্যের সংরক্ষণকালও বৃদ্ধি পাবে। এ প্রক্রিয়ার ফলে দেশের রফতানিযোগ্য আমসহ বিভিন্ন সতেজ পণ্যের প্রতি বিদেশী আমদানিকারকরা আরো আগ্রহী হবে। ফলে বৈদেশিক রফতানি বৃদ্ধির সুযোগ আরো বৃদ্ধি পাবে।

বিএডিসির কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশে বাংলাদেশের সুস্বাদু আমের বেশ চাহিদা রয়েছে। তবে এসব পণ্য রফতানির উপযোগী করে সেভাবে প্রক্রিয়াজাত হয় না। ফলে পোকা আক্রান্ত হওয়া বা দ্রুত পচে যায়। যে কারণে বিদেশী ক্রেতারা পণ্য আমদানিতে আগ্রহ দেখান না। কিন্তু এ প্লান্টের মাধ্যমে যদি এসব সমস্যার সমাধান করা যায়, তাহলে দ্রুতই বিদেশের বাজারে আমসহ বিভিন্ন ফল ও সবজির চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি অটো কনভেয়ার প্যাকেজিং লাইন নির্মাণের ফলে বাংলাদেশের রফতানিযোগ্য কৃষিপণ্যের মোড়কজাত প্রক্রিয়ারও মানোন্নয়ন ঘটবে।

বাষ্প তাপ প্রয়োগ এ প্লান্টের ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা হিসেবে রয়েছেন বিএডিসির উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্রের যুগ্ম পরিচালক ড. মো. মাহবুবে আলম। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি সম্পর্কে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বাষ্প তাপ প্রয়োগ বা ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট প্লান্টটি আম বা যেকোনো সবজিতে যে পোকামাকড় বা সেগুলোর ডিম আছে, সেটাকে ধ্বংস করে দেয়া যাবে। সাধারণত দেখা যায় আমের উপরে কিছু ফাঙ্গাস থাকে। সেগুলো আমকে পচিয়ে ফেলে। সেই ফাঙ্গাসগুলোকে মেরে ফেলার ক্ষমতা এই ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্টের রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, এ মেশিনগুলো জাপানি প্রযুক্তিতে প্রস্তুত। জাপানিরাই প্রথমে এটি ব্যবহার শুরু করেছে। সেটাই বাংলাদেশে ব্যবহার শুরু করার জন্য এ প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্লান্টটির কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করে এ কর্মকর্তা বলেন, এর ফলে আম বা অন্যান্য সবজির সংরক্ষণকাল কমপক্ষে ১৫ দিন বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই আমদানিকারকদের কাছে আমাদের পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ বাজারেও ট্রিটমেন্টকৃত ফলের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। এতে করে রফতানির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও একটি বাজার সৃষ্টি হবে।

এ প্লান্ট বাস্তবায়ন করা গেলে বিদেশের বাজারে আম ও সবজিসহ অন্যান্য কৃষিপণ্যের চাহিদা বহুগুণ বাড়বে বলে মনে করেন বিএডিসির মনিটরিং বিভাগের প্রধান মো. আ. সাত্তার গাজী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, এটা আপাতত ঢাকায় স্থাপন করা হবে। পরবর্তী সময়ে রাজশাহী ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে এই প্লান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। মূলত আমসহ বিভিন্ন রফতানিযোগ্য ফল এই প্লান্টের মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত করা হবে। তবে প্রথমিকভাবে আম টার্গেট করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের সবজির বিদেশে বড় বাজার রয়েছে। এসব সবজি এখানে রফতানিযোগ্য করা হবে। বিদেশী ক্রেতাদের কাছে সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত করে এসব কৃষিজাত পণ্য পাঠানো হবে।

বিএডিসির চেয়ারম্যান ড. অমিতাভ সরকার এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা আম ও শাকসবজি প্রক্রিয়াজাতের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করব। এর মাধ্যমে স্বল্প মূল্যে আমরা চাষীদের এ আমগুলো ট্রিটমেন্ট করে দেব। এছাড়া বিদেশে পাঠানোর জন্য যে প্যাকেট করা হয়, সেটিও আমরা করে দেব। মোড়কজাতের প্রক্রিয়াটা হবে অটোমেটিক মেশিনে। সেখানে হাতের স্পর্শ ছাড়াই সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, যারা রফতানিকারক রয়েছেন, তারা যেন আমাদের কাছ থেকে প্রক্রিয়াজাত আম সরাসরি রফতানির জন্য পাঠাতে পারেন।