দেশের ব্যাংক খাত এখন এমন এক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন একটি ব্যাংকের স্বাস্থ্য বোঝার জন্য শুধু মুনাফা কিংবা শেয়ারদরের দিকে তাকানো যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে মূলধন কতটা শক্তিশালী, খেলাপি ঋণের চাপ কতটা, আমানত ও তারল্যের অবস্থা কেমন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সমস্যা সামনে আসার পর ব্যাংকটি কীভাবে তা সামাল দিচ্ছে।
সামগ্রিক চিত্রটি অবশ্য উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের শেষে দেশের ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত বা সিআরএআর মাইনাস ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি সর্বনিম্ন ও বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পুরো ব্যাংক খাতের সামগ্রিক মূলধন অবস্থান ঋণাত্মক হয়েছে। বিপরীতে ভারতের ব্যাংক খাতের সিআরএআর ১৭ দশমিক ২০ শতাংশ, পাকিস্তানের ২০ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং শ্রীলংকার ১৯ দশমিক ৪০ শতাংশ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খেলাপি ঋণের পাহাড়। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আগের কয়েক বছরে নানা কারণে আড়ালে থাকা খেলাপি ঋণের বড় অংশ সামনে আসে। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। আর চলতি বছরের মার্চে খেলাপি ঋণের অনুপাত আরো বেড়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ হয়েছে। এমন বাস্তবতায় কোনো ব্যাংকের পুনরুদ্ধারের গল্প আলাদাভাবে দেখার প্রয়োজন আছে। সেই জায়গা থেকেই ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির (ইউসিবি) সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
২০২৪ সালের আগস্টের শেষদিকে নতুন পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা দায়িত্ব নেয়ার সময় ইউসিবির সামনে ছিল উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বড় ধরনের সমস্যা। ওই জুনে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ছিল ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। প্রকৃত চিত্র সামনে আসার পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশে। প্রভিশন ঘাটতি ছিল ৫ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা। একই সময়ে মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ১২ দশমিক ৫০ শতাংশের নিয়ন্ত্রক সীমার বিপরীতে নেমে আসে ৮ দশমিক ৪২ শতাংশে।
এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি—কোনো সমস্যার প্রকাশ ও সেই সমস্যা তৈরি করা এক বিষয় নয়। নতুন ব্যবস্থাপনা অনেক সময় পুরনো সমস্যারই হিসাব কষে। ইউসিবির ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতা বিবেচনায় রাখা দরকার। তবে এরপর ব্যবস্থাপনা কী করেছে, সেটিই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংকটি অ্যাডভান্স-ডিপোজিট অনুপাত ৯৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮৩ শতাংশে এনেছে। এতে তারল্যের ওপর চাপ কমেছে। শ্রেণীকৃত ঋণ আদায়ের জন্য বিশেষায়িত দল গঠন ও আইনি কার্যক্রমও নেয়া হয়েছে। ইউসিবির তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বার্ষিক ভিত্তিতে ঋণ আদায় বেড়েছে ১৭০ শতাংশ।
আমানতের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনটি উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালে ইউসিবির আমানত বেড়েছে ১২ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা, যা ১০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ও ১২ হাজার কোটি টাকার ব্যবস্থাপনা লক্ষ্যমাত্রা—দুটিই ছাড়িয়েছে। শুধু ডিসেম্বর ২০২৫-এ নিট নতুন আমানত এসেছে ২ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির ৪১ বছরের ইতিহাসে এক মাসে এত বেশি নিট আমানত আসেনি।
গ্রাহক সংখ্যাও এক বছরে ২২ লাখ থেকে বেড়ে ৩০ লাখ হয়েছে। ২০২৫ সালে নতুন হিসাব খোলা হয়েছে ৬ দশমিক ৮ লাখ। মোট আমানতের ৮৬ শতাংশ এসেছে ব্যক্তি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক গ্রাহকদের কাছ থেকে। অর্থাৎ ব্যাংকটির আমানতভিত্তি শুধু বড় করপোরেট গ্রাহকের ওপর নির্ভরশীল নয়।
ব্যাংকিং ব্যবসায় শেষ কথা হলো মূলধন। পর্যাপ্ত মূলধন ছাড়া একটি ব্যাংকের ঋণ দেয়ার সক্ষমতা কমে যায় এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন ও ট্রেড ফাইন্যান্সে চাপ তৈরি হয়। ইউসিবির ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকটি বছরে প্রায় ৭০০ কোটি ডলারের বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনা করে, যা দেশের মোট বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ৭ শতাংশ।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ইউসিবির মোট ঋণ পোর্টফোলিও ছিল ৬১ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেয়া কৌশলগত পুনরুদ্ধার রোডম্যাপ অনুযায়ী, পুনর্মূলধন পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে ২০২৬ সালের শেষে সিআরএআর ৮ দশমিক ৪২ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ দশমিক ২৪ শতাংশে উন্নীত করার প্রক্ষেপণ রয়েছে।
এ লক্ষ্য পূরণে চলমান রাইটস শেয়ার ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি শেয়ার ১০ টাকা মূল্যে ৭৭৫ কোটি টাকা নতুন টায়ার-১ মূলধন সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে। সাবস্ক্রিপশনের সময়সীমা ২৩ আগস্ট থেকে ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ইস্যু মূল্য ১০ টাকা, যা সাম্প্রতিক বাজারদরের কাছাকাছি।
বাজারের সংশয় তাই অস্বাভাবিক নয়। পুরো ব্যাংক খাত যখন আস্থার সংকটে, তখন বিনিয়োগকারীরা সতর্ক থাকবেন—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো ইউসিবির ক্ষেত্রে সেই সংশয় কি শুধু অতীতের সমস্যার ওপর ভিত্তি করে থাকবে, নাকি সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলোকেও বিবেচনায় নেয়া হবে?
কারণ রাইটস ইস্যুই ইউসিবির পুরো পুনর্মূলধন পরিকল্পনা নয়; এর সঙ্গে রয়েছে ৮০০ কোটি টাকার সাব-অর্ডিনেটেড বন্ড কার্যক্রম ও ২০২৭ সালের জন্য পরিকল্পিত ৭৭৫ কোটি টাকার বিদেশী কৌশলগত ইকুইটি অংশীদারত্ব। লক্ষ্য হচ্ছে মূলধন ঘাটতি সাময়িকভাবে নয়, দীর্ঘমেয়াদে কাটিয়ে ওঠা। রাইটস ইস্যুতে শেয়ারহোল্ডার ও বিএসইসির অনুমোদনও রয়েছে।
অবশ্যই ঝুঁকি শেষ হয়ে যায়নি। খেলাপি ঋণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ, মূলধন ঘাটতিও পুরোপুরি কাটেনি। পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে ঋণ আদায়, নতুন ঋণের মান, মূলধন সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিকতার ওপর। তাই ইউসিবিকে নিয়ে অতি আশাবাদী হওয়ারও কারণ নেই। আবার শুধু অতীতের সমস্যার কারণে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
একটি ব্যাংকের সংকটের সময় তার শেয়ারদর অনেক সময় ভয় দেখায়; কিন্তু তার পুনরুদ্ধারের সূচকগুলো দেখায় অন্য একটি গল্প। ইউসিবির ক্ষেত্রেও এখন সেই দুই গল্প পাশাপাশি চলছে।
একদিকে রয়েছে ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ খেলাপি ঋণ, ৮ দশমিক ৪২ শতাংশ মূলধন পর্যাপ্ততা এবং বড় প্রভিশন ঘাটতির কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে রয়েছে আমানত বৃদ্ধি, ঋণ আদায়ের গতি, গ্রাহক বৃদ্ধির তথ্য ও মূলধন পুনর্গঠনের একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা।
তাই বিনিয়োগকারীদের কাজ কোনো একটি সংখ্যাকে দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া নয়; বরং সামগ্রিক ছবিটা দেখা। বাংলাদেশের ব্যাংক খাত যে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এর মধ্যেও কিছু প্রতিষ্ঠান ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ইউসিবি সেই তালিকায় কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
একটি বিষয় এখনই বলা যায়—ব্যাংকের পুনরুদ্ধার সবসময় শোরগোল করে আসে না। কখনো কখনো তা নীরবে ঘটে, একের পর এক ছোট ছোট সংখ্যার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। ইউসিবির ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তনগুলো কতটা টেকসই হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীর। কিন্তু তা নেয়ার আগে পুরো সংখ্যাগুলো একবার দেখে নেয়া বোধহয় খারাপ হবে না।
লেখক: উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিএফও, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)










