দেশে
লবণের আনুষ্ঠানিক উৎপাদন মৌসুম শুরু হয় নভেম্বরের মাঝামাঝি
সময়ে। কিন্তু এ বছর নভেম্বর-ডিসেম্বরেও বৃষ্টি হওয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে লবণ উৎপাদন। শীত ও কুয়াশার প্রভাবেও
বিলম্বিত হয়েছে উৎপাদন কার্যক্রম। এমন পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণে তড়িঘড়ি করে এক লাখ টন
লবণ আমদানির অনুমতি দিলেও ভারতে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে দেশে যথাসময়ে পৌঁছেনি এসব লবণ। ফলে সরবরাহ চেইনে ঘাটতির কারণে অস্বাভাবিক বেড়েছে লবণের দাম। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে পণ্যটির দাম (দুই মণ) বেড়েছে ২০০-২৫০ টাকা।
বর্ষা মৌসুমের শেষার্ধেও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া ও শীতের কুয়াশাজনিত কারণে আশানুরূপ লবণ উৎপাদন হয়নি। তথ্য বলছে, ২০২২ সালের ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে লবণ উৎপাদন হয়েছিল ৫২ হাজার টন। একই সময়ে চলতি বছর লবণ উৎপাদন নেমেছে মাত্র নয় হাজার টনে। ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছিল ৮৬ হাজার টন। চলিত বছরের একই সময়ে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ২৭ হাজার ২০৭ টন।
হিসাব অনুযায়ী, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় পণ্যটির উৎপাদন কমেছে দুই-তৃতীয়াংশ। উৎপাদন কমলেও কমেনি চাহিদা। ফলে সরবরাহ চেইনে ঘাটতি দেখা দেয়ায় লাফিয়ে বাড়ছে পণ্যটির বাজার। আগের বছরের তুলনায় প্রায় তিন লাখ টন বাড়তি লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও মৌসুমের শুরুতেই ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটির বাজার অস্থিরতার দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্র বলছে, দুই-তিন সপ্তাহ আগেও দেশে দুই মণ লবণের দাম ছিল মাঠ পর্যায়ে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ১৫০ টাকা। এ সময়ের মধ্যে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি আমদানীকৃত লবণ নির্ধারিত সময়ে দেশে না পৌঁছানোয় পণ্যটির দাম বেড়েছে অন্তত ২৫০ টাকা। দেশে লবণের ভরা মৌসুমেও উৎপাদন না বাড়ায় পণ্যটির দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
বিসিক সূত্রে জানা গেছে, দেশে এ বছর লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৫ লাখ ২৮ হাজার টন। চাহিদার তুলনায় বাড়তি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হওয়ার আশা করেছে বিসিক। কিন্তু মৌসুমের শুরুতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এবং আমদানি পণ্য পৌঁছাতে বিলম্ব হওয়ায় পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়েও এর প্রভাব পড়েছে।
মিল মালিকরা বলছেন, আমদানির অনুমতি পাওয়া লবণ চলতি মাসের শেষার্ধে দেশে পৌঁছার সম্ভাবনা রয়েছে। আমদানির পর ক্রাশিং করে বাজারে পৌঁছতে আরো এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এতে দেশে লবণের বাজারে অস্থিরতা আরো কিছুদিন স্থায়ী হতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রামের মাঝিরঘাট এলাকার হাজি লাল মিয়া সল্ট অ্যান্ড ক্রাশিং ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একসময় মাঠ পর্যায়ে লবণের দাম ছিল সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা। এখন মৌসুম শুরু হওয়া সত্ত্বেও লবণ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার টাকারও বেশিতে। এ বছর আবহাওয়াজনিত কারণে লবণ উৎপাদন অস্বাভাবিক কম হয়েছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত পর্যাপ্ত লবণ উৎপাদন না হওয়ায় সংকট মোকাবেলায় এ মৌসুম আমদানিনির্ভরতায় থাকতে পারে।’
এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের লবণ আমদানি অনুমতির শর্তে রয়েছে, অনুমতি প্রদানের সাতদিনের মধ্যে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে হবে। ঋণপত্র খোলার ৩০ দিনের মধ্যে লবণ জাহাজীকরণ করতে হবে। অনুমতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে গ্রুপভিত্তিক ঋণপত্র খুলতে পারবে। আমদানির পর প্রক্রিয়াকরণ, পরিশোধন ও বাজারে বিক্রির পর এসব তথ্য বিসিকের কাছে জমা দিতে হবে। অনুমতির এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো জাহাজীকরণ করতে পারেনি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে বিসিকের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে দেশে পৌঁছানো নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন মিল মালিকরা।
বিসিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ নভেম্বর তিন ক্যাটাগরিতে ২৬৪টি মিল মালিক প্রতিষ্ঠানকে লবণ আমদানির অনুমতি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। প্রথম শ্রেণীর (এ ক্যাটাগরি) ছয়টি মিলের প্রতিটিকে ১ হাজার ৩৯৪ টন করে মোট ৮ হাজার ৩৬৪ টন, দ্বিতীয় শ্রেণীর (বি ক্যাটাগারি) ৪৯টি মিলের প্রতিটিকে ৫৫০ টন করে মোট ২৬ হাজার ৯৫০ টন, তৃতীয় শ্রেণীর (সি ক্যাটাগরি) ২০০টি মিলের প্রতিটিকে ৩০৬ টন করে মোট ৬১ হাজার ২০০ টন এবং অন্যান্য বেশকিছু মিলসহ মোট এক লাখ টন লবণ আমদানির অনুমতি দেয়া হয়। তবে নভেম্বরের শেষার্ধে ভারতে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে আমদানি করা লবণ জাহাজীকরণে বিলম্ব দেখা দেয়। এর সঙ্গে দেশে বৃষ্টি ও রোদহীন কুয়াশাচ্ছন্ন আবহওয়ার কারণে উৎপাদন কমায় বাজার সরবরাহ ঘাটতিতে পড়েছে।
দেশে ভোগ্যপণ্যের অন্যতম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শনিবার দুই মণ (৭৪ কেজি) অপরিশোধিত লবণ বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৮২০ টাকায়। অন্যদিকে ক্রাশিং করা লবণ বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকায়, যা ১০ দিন আগের বাজারদরের চেয়ে অন্তত ২৫০ টাকা বেশি। নতুন মৌসুমে লবণ উৎপাদন না বাড়লে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে আমদানীকৃত লবণ বাজারে সরবরাহ না হলে পণ্যটির দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
বিসিক কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২২ সালে ৬৬ হাজার ৪২৪ একর জমিতে ৩৯ হাজার ৪৬৭ কৃষক লবণ উৎপাদনে যুক্ত ছিলেন। ওই বছর ৬২ বছরের মধ্যে রেকর্ড ২২ লাখ ৩২ হাজার টন লবণ উৎপাদন হয়। এ বছর আরো অন্তত তিন হাজার একর জমি নতুন করে লবণ চাষের আওতায় আসবে। ফলে গত বছরের রেকর্ড ভেঙে এ বছর সর্বোচ্চ উৎপাদনের প্রত্যাশা করা হয়েছে। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জানতে চাইলে বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উৎপাদন মৌসুমের শুরুতে লবণ উৎপাদনে অনেক পিছিয়ে রয়েছি আমরা। ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ কম লবণ উৎপাদন করতে পেরেছেন চাষীরা। লবণ উৎপাদনে পর্যাপ্ত রোদ প্রয়োজন হয়। কিন্তু এ সময় বৃষ্টি, মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া ও কুয়াশার কারণে উৎপাদন কমে গেছে। তবে দাম ভালো থাকায় আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাড়তি উৎপাদনের মাধ্যমে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হতে পারে।’










