সিয়াম সাধনার মাস রমজান। আর এ মাসে বাঙালি মুসলমানদের কাছে ইফতারির প্রধান পণ্য ছোলা, যার প্রায় শতভাগই আমদানি করতে হয়। তার পরও মোটামুটি কম দামেই পাওয়া যায়। তবে চলতি বছর ঋণপত্র খুলতে জটিলতা, ডলার সংকটসহ বিবিধ অজুহাত দেখিয়ে ছোলার বাজারে কৃত্রিম সংকট দেখানো হচ্ছে। এতে এক মাসের ব্যবধানে পণ্যটির মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) দাম বেড়েছে ৪০০-৫০০ টাকা। রোজা ঘনিয়ে আসার আগে দাম আরো বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা।
ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে সীমিত পরিসরে ছোলা উৎপাদন হলেও চাহিদার সিংহভাগই আসে অস্ট্রেলিয়া, মিয়ানমার, তানজানিয়া থেকে। চলতি বছর চাহিদার তুলনায় আমদানি কম হওয়ায় রোজায় পণ্যটির দাম বেশি হবে বলেই ধরে নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে আগে থেকেই মজুদের পাশাপাশি বিক্রির ক্ষেত্রে বাড়তি দাম হাঁকিয়ে পণ্যমূল্য বাড়ানো হয়েছে কৌশলে। এক মাসের ব্যবধানে ছোলার দাম বেড়েছে তাই রেকর্ড পরিমাণ।
বিভিন্ন ট্রেডিং ও পাইকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দেয়া তথ্যে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি মণ ছোলা বিক্রি হচ্ছে সর্বনিম্ন ৩ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৪০০ টাকায়। এক মাস আগেও যা ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে লেনদেন হয়েছিল। মূলত সর্বশেষ দুই সপ্তাহেই ছোলার দাম সর্বোচ্চ বেড়েছে। রমজান মাস ঘনিয়ে আসায় দাম আরো বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
পাইকারি বাজারে বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, তানজানিয়া ও ভারত থেকে আমদানি করা ছোলা। আগে মিয়ানমার থেকে আমদানি হলেও চলতি মৌসুমে এখনো প্রতিবেশী দেশটির ছোলা আসেনি। পাইকারিতে অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি হওয়া ছোলা প্রতি মণ ৩ হাজার ১০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকায় লেনদেন হতে দেখা গেছে। এছাড়া তানজানিয়ার ছোলা বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকায়।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে এক বছরে যে পরিমাণ ছোলা বিক্রি হয় তার অর্ধেকই হয় কেবল রমজান মাসে। এ কারণে বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে আমদানিকারক ও মজুদদার ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। অনেক সময় পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও বড় ব্যবসায়ীদের বেঁধে দেয়া দামের সঙ্গে সমন্বয় করতে ছোলার দাম বাড়ানো হয়। দেশে মুষ্টিমেয় কয়েকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ছোলা আমদানির সঙ্গে যুক্ত থাকায় সহজেই পণ্যটির দাম বাড়িয়ে দেয়া সম্ভব হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জে পাইকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মেসার্স গাউসিয়া ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ছোলার বাজার রোজার চাহিদার ওপর নির্ভর করে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা তার আগেই আমদানিকারকদের কাছ থেকে ছোলা সংগ্রহ করে বিক্রি করেন। আমদানিকারক পর্যায় থেকে যে দর পাওয়া যায় তার সঙ্গে লভ্যাংশ যুক্ত করেই দাম নির্ধারণ করা হয়।’
এক্ষেত্রে ছোলার দাম বৃদ্ধিতে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কোনো হাত নেই বলে দাবি করেছেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করে একাধিক ব্যবসায়ী দাবি করেছেন, রোজার এক সপ্তাহ আগে ও রোজার সময় সরকারি পর্যায়ে বাজার মনিটরিং কমিটির অভিযান থাকায় কৌশলে কয়েক মাস আগেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়। মূলত বর্তমানে দাম বাড়িয়ে অধিক মুনাফা তুলে নেয়ার পর বাজার মনিটরিং কমিটির অভিযানকালীন সমন্বয় করে কমানোর কৌশল নিয়েছে আমদানিকারক ও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ীরা। তাই দেশের পণ্যমূল্যের দাম স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি রোজায় অস্বাভাবিক মুনাফা রোধ করতে কয়েক মাস আগে থেকেই বাজার মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি বলে মনে করছেন এ ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রাম ডাল মিল ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা জানিয়েছেন, ছোলার বিকল্প হিসেবে সাধারণ মানুষের মধ্যে অ্যাংকর বা ডাবলি ডালের প্রচলন রয়েছে। ফলে ছোলার দাম বৃদ্ধির কারণে ডাবলির দামও অস্বাভাবিক পরিমাণ বেড়েছে। আগে প্রতি কেজি (আস্ত) বিক্রি হতো ৩৫-৪০ টাকায়। বর্তমানে একই মানের ডাবলি বিক্রি হচ্ছে ৫৮ টাকা কেজি দরে। সর্বশেষ এক সপ্তাহেই ডালটির দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ২ টাকা। বাজার নিয়ন্ত্রণে এখন থেকেই ব্যবস্থা নেয়া না হলে রোজার নিত্যপণ্যের দাম কারসাজির মাধ্যমে আরো বাড়ানোর শঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।










