ভূমিকম্প, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও সুনামির মতো দুর্যোগে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয় বিপুলসংখ্যক বাড়িঘর। এতে হুমকির মুখে পড়ে মানুষের জীবন ও জীবিকা। একই সঙ্গে বাড়ে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের ব্যয়। জাতিসংঘের হিসাবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে আবাসন খাতে বছরে প্রায় ২২৮ বিলিয়ন বা ২২ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়। পরিস্থিতি মোকাবেলায় নিরাপদ বাড়িঘর নির্মাণ, পুরনো ভবন শক্তিশালী করা ও দুর্যোগের আগাম প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়ার কথা জানায় সংস্থাটি।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘প্রতি বছর লাখ লাখ বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়। এতে পরিবারগুলো বাসস্থান হারায় ও দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা এখন সরকার, আবাসন উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান, প্রকৌশলী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর যৌথ দায়িত্ব।’
জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক দপ্তর ইউএনডিআরআরের তথ্যানুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, সুনামি ও ভূমিকম্পের কারণে সরাসরি যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তার ৪৩ শতাংশই আবাসন খাতসংশ্লিষ্ট। দুর্যোগে শুধু প্রাণহানি বা অবকাঠামোরই ক্ষতি হয় না, বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘর হারিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটেও পড়ে। নিরাপদ বাড়িঘর নির্মাণ ও বিদ্যমান আবাসন শক্তিশালী করা গেলে এ ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে উল্লেখ করেন মহাসচিব।
জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক দপ্তরের মুখপাত্র জিনেট এলসওর্থ বলেন, ‘দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রে সহনশীল বাড়িঘর নির্মাণের পাশাপাশি পরিবারগুলোর প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ। আগাম সতর্কবার্তা পেলেও প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি না থাকলে অনেক মানুষ সময়মতো পদক্ষেপ নিতে পারে না।’
লয়েডস রেজিস্টার ফাউন্ডেশনের ওয়ার্ল্ড রিস্ক পোল ২০২৬-এর তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া সত্ত্বেও অনেক পরিবারের কোনো দুর্যোগ পরিকল্পনা ছিল না। পাশাপাশি নিজেদের সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসও ছিল না তাদের। ফলে ২৭ শতাংশ পরিবারই কেবল সতর্কবার্তা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পেরেছে।’
এলসওর্থ আরো বলেন, ‘গত ১১ বছরে দুর্যোগে প্রাণহানি কমানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রে একই ধরনের অগ্রগতি দেখা যায়নি। এ কারণে প্রতিটি পরিবারের কাছে ঝুঁকিসংক্রান্ত তথ্য, আগাম সতর্কবার্তা ও নিজেদের সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনীয় উপকরণ পৌঁছে দেয়া জরুরি।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগের সময় বাড়িঘর নিরাপদ থাকলে প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি কমে। একই সঙ্গে মানুষ দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে। তাই দুর্যোগ ঝুঁকি কমানোর পরিকল্পনায় আবাসনকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
জাতিসংঘের মতে, দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সরকার, বেসরকারি খাত ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণ বন্ধ করা, ভবন নির্মাণে নিরাপত্তার মানদণ্ড কার্যকর করা ও পুরনো বাড়িঘরকে আরো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে।
একই সঙ্গে দুর্যোগের আগে কী করতে হবে, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে পরিবারগুলোকে। এতে আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার পর মানুষের দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার সক্ষমতা বাড়বে। এক্ষেত্রে শুধু নতুন বাড়ি নির্মাণের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বিদ্যমান বাড়িঘর মেরামত ও শক্তিশালী করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক এলাকায় মানুষের পক্ষে দুর্যোগ সহনশীল নতুন বাড়ি নির্মাণের ব্যয় বহন করা কঠিন। পুরনো বাড়ির কাঠামো উন্নত করা গেলে তুলনামূলক কম খরচে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে নেপাল, ভেনিজুয়েলা ও কলম্বিয়ায় ঘটে যাওয়া দুর্যোগ পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা এবং তথ্য সংগ্রহের গুরুত্ব সামনে এনেছে। এসব ঘটনায় দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা, আশ্রয় কেন্দ্রের অবস্থা ও আবাসন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকলে সহায়তা কার্যক্রম আরো কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়।
জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, নেপালে গত আগস্টে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় ৮৪ হাজারের বেশি মানুষ ও প্রায় ৭ হাজার ৫০০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাস্তুচ্যুত ৩ হাজার ৬৫০ জনকে শনাক্ত করা হয়। এছাড়া কলম্বিয়ায় গত আগস্টের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ ও দুই লাখের বেশি বাড়িঘর। দেশটির কালি শহরে বাস্তুচ্যুত হয় আনুমানিক ২০ হাজার পরিবার।
সব মিলিয়ে জাতিসংঘের বার্তা, দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে শুধু ঘটনার পর ত্রাণ ও পুনর্বাসনে ব্যয় বাড়ালে চলবে না। বরং দুর্যোগের আগেই নিরাপদ বাড়িঘর, কার্যকর সতর্কবার্তা ও স্থানীয় প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। এতে প্রাণহানি কমানোর পাশাপাশি আবাসন খাতে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং মানুষের দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগও কমানো সম্ভব।










