বিশ্বের মোট কোকোর চাহিদার অর্ধেক জোগান দেয় পশ্চিম আফ্রিকার দুই দেশ আইভরি কোস্ট ও ঘানা। চকোলেটের প্রধান এ কাঁচামাল উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত দেশ দুটির প্রায় ২০ লাখ কৃষক পরিবার। তবে গত এক বছরে বাম্পার ফলন সত্ত্বেও দেশ দুটির কোকো বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। অবিক্রিত পণ্যের স্তূপ আর বিশ্ববাজারে আকস্মিক দরপতন দেশ দুটির অর্থনীতিকে বড় ধরনের অস্থিরতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

সংকটের সূত্রপাত

আইভরি কোস্ট ও ঘানায় কোকো উন্মুক্তভাবে কেনাবেচা হয় না। সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এক বছর আগেই আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের কাছে প্রায় ৮০ শতাংশ কোকো বিক্রির চুক্তি করে। এ বিক্রির ওপর ভিত্তি করে প্রতি বছর অক্টোবরে কৃষকদের জন্য একটি নির্দিষ্ট দাম নির্ধারিত হয়। গত বছর যখন এ দর নির্ধারণ করা হয়েছিল, তখন বিশ্ববাজারে কোকোর দাম ছিল ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু চলতি বছরে চিত্রটি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ফলন ভালো হওয়ায় বাজারে কোকোর সরবরাহ বেড়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম কমেছে প্রায় অর্ধেক।

চাহিদা হ্রাস ও ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহ

২০২৪ সালে কোকোর দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছলে বিশ্বজুড়ে চকোলেট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যের আকার ছোট করতে শুরু করে। একই সঙ্গে কোকো বাটারের পরিবর্তে বিকল্প চর্বি ও অন্যান্য উপাদানের ব্যবহার বাড়িয়ে দেয়া হয়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে কোকোর চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে প্রতি টন কোকোর দাম ৩ হাজার ১০০ ডলারে নেমে এলেও আইভরি কোস্ট ও ঘানাকে আগের চুক্তি অনুযায়ী ৫ হাজার ডলারের বেশি দরে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে। মূল্যের এ বড় পার্থক্যের কারণে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীরা দেশ দুটি থেকে কোকো কেনা বন্ধ করে দিয়েছে।

cocoa sales crisis

অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব

কোকো বিক্রি না হওয়ায় আইভরি কোস্ট ও ঘানার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের টান পড়েছে। আইভরি কোস্টের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে এ খাত থেকে। অন্যদিকে ঘানা আগে থেকেই বড় ধরনের ঋণ সংকটে ভুগছে। দেশ দুটির গুদামে বর্তমানে বিপুল পরিমাণ কোকো অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে বকেয়া টাকা না পেয়ে হাজার হাজার কৃষক সংকটে পড়েছেন। দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা এ বিশাল জনগোষ্ঠী এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে।

বর্তমান পরিস্থিতি

সংকট মোকাবিলায় আইভরি কোস্ট সরকার এরই মধ্যে কৃষকদের কাছ থেকে ১ লাখ টন অবিক্রিত কোকো কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে ঘানা কোকোর নির্ধারিত দাম প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে দিয়েছে। আইভরি কোস্টও মার্চের শুরু থেকে কৃষকদের জন্য নির্ধারিত মূল্য কমানোর পরিকল্পনা করছে, যেন আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীরা পুনরায় কোকো কিনতে আগ্রহী হয়। তবে বিশ্ববাজারের এ অস্থিরতা দ্রুত না কাটলে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ দুটির অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত তৈরি হতে পারে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

রয়টার্স অবলম্বনে