দেশের অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহূত এলআরপিসি, কনটিনিউয়াস আর্ক ওয়েল্ডিং ওয়্যার ও এসিএসআর কোর ওয়্যারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ওয়্যার প্রডাক্টসের ক্ষেত্রে এতদিন আমদানিনির্ভরতা ছিল। কিন্তু সম্প্রতি দেশে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের উদ্যোগে এ নির্ভরতা কেটেছে। প্রায় ৫০০ কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগে স্থাপন করা কারখানায় এ তিন পণ্যের উৎপাদন শুরু করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় রড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম। শিল্প গ্রুপটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম ওয়্যারস পরীক্ষামূলক উৎপাদন শেষ করে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে এরই মধ্যে বাজারজাত শুরু করেছে।
অভ্যন্তরীণ বাজারে এলআরপিসি, কনটিনিউয়াস আর্ক ওয়েল্ডিং ওয়্যার ও এসিএসআর কোর ওয়্যারের সম্মিলিত বার্ষিক চাহিদা মোট ৪৬ হাজার টন। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে ওয়্যার ড্রয়িং শিল্প স্থাপন করে এ তিন পণ্যের উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা হয়েছে ৫৬ হাজার টন। এর মধ্যে এলআরপিসি (লো রিল্যাক্সেশন প্রি-স্ট্রেসড কংক্রিট) বছরে ৩০ হাজার টন, কনটিনিউয়াস আর্ক ওয়েল্ডিং ২৪ হাজার টন এবং এসিএসআর কোর ওয়্যার (জিএমএডব্লিউ) উৎপাদনে দুই হাজার টনের সক্ষমতা গড়ে তোলা হয়েছে।
তবে নতুনভাবে বিনিয়োগ করা স্থানীয় এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে বর্তমান শুল্ক কর কাঠামো একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন খাতটির উদ্যোক্তা।
কারণ হিসেবে তারা বলছেন, এসব পণ্য আমদানি পর্যায়ে নামমাত্র শুল্কহারের এইচএস কোডে (হারমোনাইজড কমোডিটি ডেসক্রিপশন অ্যান্ড কোডিং সিস্টেমস) শুল্কায়ন ছাড়াও রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা ঘটছে। এ পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে শুল্কহার পুনর্বিন্যাস ও সংশোধনের সুপারিশ তুলে ধরতে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে আবেদন জানিয়েছে বিএসআরএম।
কাস্টমসের তথ্যমতে, দেশে বিভিন্ন ধরনের ওয়্যার প্রডাক্টস মূলত আমদানি হচ্ছে চীন ও ভারত থেকে। এর মধ্যে কনটিনিউয়াস আর্ক ওয়েল্ডিং ওয়্যার ৮৩১১.৩০.০০, ৮৩১১.৯০.০০ কিংবা ৭২১৭.৩০.০০ এইচএস কোড অনুযায়ী কোনো একটিতে সুবিধা অনুযায়ী শুল্কায়ন করে নিচ্ছে আমদানিকারকরা, যেটি কাস্টমস আইন পরিপন্থী। এসব কোডের বিপরীতে বর্তমানে যথাক্রমে ১০ শতাংশ, ১০ শতাংশ ও ৫ শতাংশ শুল্কহার নির্ধারিত রয়েছে। এক্ষেত্রে চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে দেশেই আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে স্থানীয় উৎপাদন নিশ্চিত হওয়ায় ভিন্ন এ তিনটি এইচএস কোডে শুল্কহার বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ (সিডি ২৫ শতাংশ ও এসডি ১০ শতাংশ) করার প্রস্তাব করেছে বিএসআরএম।
এছাড়া এসিএসআর কোর ওয়্যারের (জিএমএডব্লিউ) জন্য বর্তমানে ৭২১৭.২০.০০ এইচএস কোড নির্ধারিত রয়েছে। এখানে আমদানি পর্যায়ে শুল্কহার মোট ১০ শতাংশ। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন শুরু হওয়ায় এইচএস কোডের বিপরীতে শুল্কহার বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ (সিডি ২৫ শতাংশ ও এসডি ১০ শতাংশ) করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। অপর আমদানিনির্ভর পণ্য এলআরপিসি ব্রিজ, কালভার্ট, ফ্লাইওভারসহ দেশের অবকাঠামো নির্মাণে ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হচ্ছে। এটি ৭২১৭.১০.০০ এইচএস কোড অনুযায়ী শুল্কায়ন হচ্ছে। যেখানে শুল্কহার মাত্র ৫ শতাংশ নির্ধারিত। কিন্তু এখন চাহিদার চেয়ে স্থানীয়ভাবেই বেশি সক্ষমতা তৈরি হওয়ায় এইচএস কোডটিতে শুল্কহার বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ (সিডি ২৫ শতাংশ ও এসডি ১০ শতাংশ) করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে বর্তমানে বিদ্যমান ভর্তুকীকৃত শুল্কহার নিশ্চিত করে এমন সব এসআরও বাতিল করার প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে।
বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা এ শিল্পে বিনিয়োগের আগে এলআরপিসি, কনটিনিউয়াস আর্ক ওয়েল্ডিং ওয়্যার ও এসিএসআর কোর ওয়্যারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ওয়্যার প্রডাক্টস সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর ছিল। শুধু দেশে না, একই ছাদের নিচে এসব পণ্য উপমহাদেশে আর কোনো প্রতিষ্ঠানই তৈরি করে না। উৎপাদনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করেই দেশে যে চাহিদা তার চেয়ে বেশি উৎপাদন সক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া ভবিষ্যতে প্রয়োজনে উৎপাদন পরিসর আরো বড় করতে পারার সুযোগও রাখা হয়েছে। আগে আমদানির অপরিহার্যতা থাকলেও এখন এ খাতে বিনিয়োগ করায় বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। এজন্য শুল্কহার পুনর্বিনাস জরুরি। ফলে স্থানীয়ভাবে গড়ে তোলা এ শিল্পকে টিকিয়ে সামনে এগিয়ে নেয়ার স্বার্থে আমদানি পর্যায়ে শুল্কহার পুনর্বিনাস ও সংশোধনের আবেদন জানানো হয়েছে।










