বিদ্যুৎ, গ্যাস, কয়লাসহ উৎপাদন উপকরণের দাম বেড়েছে। সর্বশেষ বছরে শ্রমিকদের মজুরিও বাড়ানো হয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে দেশের চা খাতে। চলতি নিলামবর্ষে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে চায়ের দাম। মৌসুমের প্রথম ১০টি নিলামের তথ্য পর্যালোচনায় এ চিত্র দেখা গেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিরূপ আবহাওয়ার কারণে ভরা মৌসুমেও চায়ের পর্যাপ্ত উৎপাদন নেই। বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে গেছে। পরিমাণ ও মানের দিক থেকে ভালো চা উৎপাদন হচ্ছে না। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও কয়লার দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বর্তমান নিলামে চায়ের দাম বাড়লেও উৎপাদন খরচের কারণে আশানুরূপ লাভের ধারায় ফিরতে পারছে না বাগানগুলো।
চলতি মৌসুমে চট্টগ্রামে ৪৬টি ও শ্রীমঙ্গলে ২৩টি আন্তর্জাতিক নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। এরই মধ্যে চট্টগ্রামে ১০টি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়েছে। শ্রীমঙ্গলে হয়েছে ছয়টি। প্রতি সপ্তাহের সোমবার চট্টগ্রামে ও শ্রীমঙ্গলে বুধবার নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৩-২৪ মৌসুমে চট্টগ্রামের প্রথম নিলামে কেজিপ্রতি চা বিক্রি হয়েছিল গড়ে ২৪৯ টাকা ২৪ পয়সায়। ওই নিলামে প্রস্তাব হওয়া ৮৮ শতাংশ চা-ই কিনে নিয়েছিল ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। নিলামবর্ষ শুরুর কয়েক মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও বর্তমান নিলামগুলোয় চা বিক্রি হচ্ছে গড়ে ২১৮-২২০ টাকা কেজি দরে। যদিও আগের নিলামবর্ষের একই সময়ে চায়ের গড় দাম কেজিপ্রতি ২০০ টাকার নিচে ছিল। চলতি মৌসুমে চা উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিলামে এর প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন বাগান মালিকরা।
বাংলাদেশ চা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশের বেশি চা বিক্রি হয় চট্টগ্রাম নিলামে। সর্বশেষ ২০২২-২৩ মৌসুমে চট্টগ্রাম নিলামে ৮ কোটি ৮৭ লাখ ৪৯ হাজার কেজি চা বিক্রি হয়। বিক্রি হওয়া এসব চায়ের কেজিপ্রতি গড় দাম ছিল ১৯৬ দশমিক ৫৮ পয়সা। চলতি মৌসুমের ১০টি নিলাম শেষ হওয়ার পরও চায়ের কেজিপ্রতি দাম ২০০ টাকার বেশি থাকায় মৌসুম শেষে চায়ের গড় দামও বাড়তি থাকবে বলে মনে করছেন চা বোর্ড কর্মকর্তারা।
নিলাম সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৩ মৌসুমের প্রথম নিলামে চা বিক্রি হয়েছিল গড়ে ২২২ টাকায়। ওই সময় ১০তম নিলামে এসে চায়ের গড় দাম কেজিপ্রতি ২০০ টাকার নিচে চলে এসেছিল। কিন্তু উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিসহ নানা প্রতিবন্ধকতায় এ বছর এখনো চা বিক্রি হচ্ছে পূর্ববর্তী মৌসুমের প্রথম নিলামের দামেই। বাড়তি চাহিদার পাশাপাশি পর্যাপ্ত চা সরবরাহ না থাকায় আসন্ন নিলামগুলোয়ও চায়ের দাম বাড়তি থাকতে পারে বলে মনে করছেন তারা। বাড়তি মূল্য সত্ত্বেও বাগানগুলো লোকসানে আছে বলে দাবি চা বাগান মালিকদের।
চট্টগ্রামের টিকে গ্রুপের মালিকানাধীন বাগানের সংখ্যা তিনটি। গ্রুপটির বারোমাসিয়া, রাঙাপানি ও এলাহীনূর চা-বাগানের কো-অর্ডিনেটর জসিম উদ্দিন চা খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চা উৎপাদন খাত এখন কঠিন সময় পার করছে। বিরূপ আবহাওয়ার পাশাপাশি জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে আশানুরূপ রিটার্ন আসছে না। নিলামেও চায়ের ভালো দাম না পাওয়ায় বাগান মালিকরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন।’
প্রসঙ্গত, দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার দাবিতে ২০২২ মালের ৯ আগস্ট থেকে ধর্মঘট করে সারা দেশের চা শ্রমিকরা। বাগান মালিকরা ধর্মঘট প্রত্যাহারে ব্যর্থ হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি বাড়িয়ে ১৭০ টাকা নির্ধারণ করে দেন। প্রায় ১৮ দিনের ওই ধর্মঘটের কারণে গত মৌসুমে চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ও গুণগত মান কমে যায়। শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানিসহ বিভিন্ন কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে চলতি মৌসুমে চা উৎপাদন খরচ বেড়েছে বলে জানান বাগান মালিকরা।
দেশের ১৬৮টি বাগান ও উত্তরবঙ্গের ক্ষুদ্রায়তন চাষীদের মাধ্যমে দেশে চা উৎপাদন হয়। এসব চা উৎপাদনের পর নির্দিষ্ট ওয়্যারহাউজে রেখে দেশের দুটি আন্তর্জাতিক নিলামে বিক্রির জন্য ব্রোকার্স প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নমুনা পাঠানো হয়। এসব নমুনা ব্রোকার্স প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চা বোর্ডের নিবন্ধিত ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো সংগ্রহ করে নির্ধারিত নিলাম থেকে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কিনে নেয়। নিলামে চা ক্রয়ের ১৫ শতাংশ শুল্ক, ১ শতাংশ ব্রোকার্স চার্জ, ১ শতাংশ চা বোর্ডের চার্জ পরিশোধ সাপেক্ষে ডিও (সরবরাহ আদেশ) নিয়ে নির্দিষ্ট ওয়্যারহাউজ থেকে চা সংগ্রহ করে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো।
বাগান মালিক কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০২২ সালে শুরুর দিকে প্রতি কেজি কয়লার দাম ছিল ৮ থেকে সাড়ে ৮ টাকা। বর্তমানে একই মানের কয়লা কিনতে হচ্ছে ২২-২৫ টাকায়। বিদ্যুতের দাম বেড়ে গেছে। জ্বালানি তেলের দামও বেড়েছে এক বছরের ব্যবধানে। বিকল্প হিসেবে অনেক বাগান মালিক কাঠ, ভুসিসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করছে। নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে ঊর্ধ্বমুখী পরিবহন ব্যয়ও। নিলাম পদ্ধতির কারণে চাইলেও চায়ের দাম নির্ধারণ করে দিতে না পারায় লোকসানের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন তারা।
জানতে চাইলে চট্টগ্রামের উদালিয়া চা বাগানের ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের চা খাত এ মৌসুমে বড় সংকটের মধ্যে পড়েছে। চলতি বছর শুষ্ক আবহাওয়ায় চা উৎপাদন কমেছে। অনেক বাগানেই গাছ মরে গেছে। নতুন চারা রোপণের হারও কম। জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।’ উৎপাদন খরচ অতীতের সব রেকর্ড ভাঙবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
দেশে চা উৎপাদনের ভরা মৌসুম চলে জুন-অক্টোবর পর্যন্ত। এ সময় দুই-তৃতীয়াংশ চা উৎপাদন করে বাগানগুলো। সর্বশেষ নিলামে বিক্রির জন্য চা প্রস্তাব হয়েছে ২৩ লাখ ৯২ হাজার ৮৫৫ কেজি। যদিও আগের মৌসুমের একই নিলামে চা প্রস্তাব হয়েছিল ২৬ লাখ ৪২ হাজার কেজি। জুন-জুলাইয়ে আগের বছরের তুলনায় কম চা উৎপাদনের কারণে চলতি বছর চা বোর্ডের ১০ কোটি ২ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।










