দেয়ালে রুপালি ডাক্ট টেপ দিয়ে আটকানো একটি অতিপরিচিত ফল, ‘কলা’। দেখলে মনে হতে পারে, এটি কোনো সাধারণ মজার কাণ্ড। কিন্তু শিল্পী মরিজিও ক্যাটেলানের কাছে এটি একটি শিল্পকর্ম। নাম ‘কমেডিয়ান’। ২০১৯ সালে প্রথম প্রদর্শনের পর ‘শিল্পকর্মটি’ নিয়ে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। কেউ হাসাহাসি করেন। কেউ প্রশ্ন তোলেন এর শিল্পমূল্য নিয়ে। আবার কেউ এটিকে সমকালীন শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখেন।
বিতর্কের পাশাপাশি বাড়তে থাকে এর দামও। ২০১৯ সালে কমেডিয়ানের দুটি সংস্করণ ১ লাখ ২০ হাজার ডলার করে বিক্রি হয়। পরে তৃতীয় ও শেষ সংস্করণটি বিক্রি হয় ১ লাখ ৫০ হাজার ডলারে। এরপর ২০২৪ সালে তিনটি সংস্করণের একটি ফের বিক্রি হয় নিলামে। সেবার দাম ওঠে ৬২ লাখ ৪০ হাজার ডলারে। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার মূল্য কয়েক কোটি টাকা।
কমেডিয়ান প্রথম প্রদর্শিত হয় ২০১৯ সালের ৪ ডিসেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি বিচে আর্ট বাসেল মেলার ভিআইপি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এটি প্রদর্শন করা হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই কমেডিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। অনেকে এটিকে নিয়ে ঠাট্টা করেন। কেউ বিস্মিত হন। কেউ আবার শিল্পকর্মটির বুদ্ধিবৃত্তিক ও নান্দনিক মূল্য নিয়ে বিতর্কে জড়ান। এমনকি ডাক্ট টেপ ও কলা ব্যবহার করে অনেকে এর অনুকরণে মিমও তৈরি করতে শুরু করেন।
সাংবাদিক ক্যাসকোনই প্রথম এ নিয়ে বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, শিল্পকর্মটির দুটি সংস্করণ ১ লাখ ২০ হাজার ডলার করে বিক্রি হয়েছে। পরে তৃতীয় সংস্করণটিও ১ লাখ ৫০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়।
তবে ক্রেতারা দেয়ালে আটকানো সে নির্দিষ্ট কলাটি কিনে নেননি। তারা পেয়েছেন শিল্পকর্মটির সত্যতা প্রমাণের সনদ ও এটি প্রদর্শনের নির্দেশনা। সে নির্দেশনায় ফলটি নিয়মিত পরিবর্তনের কথাও বলা ছিল। অর্থাৎ শিল্পকর্মটির মূল বিষয় শুধু একটি কলা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত ধারণা, শিল্পীর নির্দেশনা ও সত্যতা সনদও এর অংশ।
বিতর্কও শিল্পের কৌশল
ক্যাটেলানের অন্যতম কৌশল হলো বিতর্ক তৈরি করা। তার মতে, প্রতিযোগিতামূলক সৃজনশীল শিল্পে শুধু দক্ষতা বা বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সফল হওয়া সবসময় সহজ নয়। বিতর্ক তৈরি হলে মনোযোগ বাড়ে। মনোযোগ বাড়লে দর্শকও বাড়ে। এর সঙ্গে ভবিষ্যতে আরো কাজ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শিল্পের ইতিহাসেও এর অনেক উদাহরণ রয়েছে। প্রায় ৪০০ বছর আগে ইতালীয় শিল্পী কারাভাজ্জিও তার ধর্মীয় চিত্রকর্মে সহিংসতা ও অন্ধকার আবহ ব্যবহার করে সমসাময়িক শিল্পীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করেছিলেন। একই সঙ্গে এসব বৈশিষ্ট্য তাকে আন্তর্জাতিক পরিচিতিও এনে দেয়।
উনিশ শতকের জেএমডব্লিউ টার্নার, জন কনস্টেবল, এদুয়ার মানে, ক্লদ মোনে, পল গগ্যাঁ, জেমস ম্যাকনিল হুইসলার ও পল সেজানের মতো শিল্পীরাও নতুন ধরনের শিল্পচর্চা শুরু করেছিলেন। এসব কাজ সে সময় সমালোচকদের বিদ্রূপের মুখে পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাদের অনেককেই শিল্পের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়। ফলে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এসে শিল্পের নতুনত্ব ও মূলধারার সমালোচনাকে অনেকটা একই মুদ্রার দুই পিঠ হিসেবে দেখা শুরু হয়।
এ ইতিহাসের আলোকে কমেডিয়ানকে দেখলে দেয়ালে আটকানো একটি ফলের চেয়ে গল্পটি অনেক বড়। এটি শুধু একটি শিল্পকর্মের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন নয়। বরং শিল্পী কীভাবে বিতর্ক তৈরি করে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেন, কীভাবে সে মনোযোগ বাজারমূল্যে প্রভাব ফেলতে পারে এবং শিল্পের মূল্য কীভাবে নির্ধারণ হয়—কমেডিয়ান সে প্রশ্নগুলোও সামনে নিয়ে এসেছে। বিবিসি অবলম্বনে










