আইনি মারপ্যাঁচে শুধু বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর তালিকাভুক্ত প্রায় এক হাজার নন-বন্ডেড শিল্পপ্রতিষ্ঠানের রফতানি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মধ্যে নীতির সামঞ্জস্য না থাকায় এ ধরনের শিল্প মালিকরা এখন দিশেহারা। বন্ড লাইসেন্স না থাকলে ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র ইস্যু না করার নির্দেশনা থেকে এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। যদিও ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সাময়িকভাবে এ নির্দেশনা স্থগিত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে স্থায়ী সমাধান চেয়ে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখেছে বিজিএমইএ। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে দিয়েছে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
বাংলাদেশে তৈরি পোশাক রফতানিকারকরা দীর্ঘদিন ধরে বন্ড ও নন-বন্ডের আওতায় তৈরি পোশাক রফতানি করে আসছে। কিন্তু নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ব্যাংক টু ব্যাক এলসি খোলা যাবে না বলে গত ৩১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকে নির্দেশনা দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বিজিএমইএ বলছে, বিদেশী ক্রেতার কাছ থেকে রফতানি আদেশ পাওয়ার পর কাঁচামাল ও আনুষঙ্গিক উপকরণ আমদানির মাধ্যমে পণ্য উৎপাদন করে রফতানি করতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু কোনো রফতানিকারক যদি বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি না করে স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত কাঁচামাল ও আনুষঙ্গিক উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে পণ্য রফতানি করে, সেক্ষেত্রে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ লাইসেন্স থাকার প্রয়োজন নেই। তাছাড়া বন্ড লাইসেন্স ব্যবস্থাপনা একটি জটিল বিষয়। এক্ষেত্রে সরকারের রাজস্ব ঝুঁকির সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই বন্ড লাইসেন্সবিহীন শতভাগ রফতানিকারকদের সরকার উৎসাহ দিয়ে থাকে।
এদিকে আমদানি নীতি আদেশ ২০১৫-১৮-এর পঞ্চম অধ্যায়ে দেখা গেছে, রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পণ্যাদি আমদানির ক্ষেত্রে কেবল বন্ডেড ওয়্যারহাউজ পদ্ধতির অধীনে স্বীকৃত তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্রের বিপরীতে কাঁচামাল আমদানি করতে পারবে। কিন্তু যেসব নন-বন্ডেড ফ্যাক্টরি স্থানীয় বাজার থেকে ব্যাক টু ব্যাক এলসি ইস্যু করে কাঁচামাল সংগ্রহ করবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই।
বিজিএমইএ বলছে, বর্তমানে সংগঠনটির তালিকাভুক্ত সচল কারখানা রয়েছে প্রায় ২ হাজার ১০০। এর মধ্যে ৩৮৭ কারখানা নন-বন্ডেড। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা ছোট পরিসরে ব্যবসা পরিচালনা করেন। নিজ উদ্যোগে বিদেশ থেকে অর্ডার এনে দেশীয় সুতা থেকে কাপড় বানিয়ে, অ্যাকসেসরিজ সংগ্রহ করে বিদেশে পণ্য রফতানি করেন। অনেক প্রতিষ্ঠান সাবকন্ট্রাক্টিং করে। এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হলে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে। এতে প্রায় ২ লাখ ৫৮ হাজার শ্রমিক বেকার হবেন।
বিজিএমইএর চিঠিতে আরো বলা হয়, এনবিআরের নির্দেশনা সাময়িক স্থগিত করা হলেও বিষয়টি স্থায়ী সমাধান হওয়া প্রয়োজন। তাই তৈরি পোশাক শিল্পের এ সংকটাপন্ন সময়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে রফতানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে নন-বন্ডেড প্রাতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র খোলার অনুমোদনের জন্য আমদানি নীতি আদেশ ২০১৫-১৮-এর পঞ্চম অধ্যায়ের বিধি ২৪ (৯)(ক) যথাযথভাবে সংশোধনের অনুরোধ করা হলো।
এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি এসএম মান্নান (কচি) বণিক বার্তাকে বলেন, বেশকিছু প্রতিষ্ঠান শতভাগ স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহারের মাধ্যমেই তাদের রফতানি কার্যক্রম পরিচালনা করে। তাদের মূল্য সংযোজনও শতভাগ। এ অবস্থায় ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলার ক্ষেত্রে বন্ড লাইসেন্স থাকার বাধ্যবাধকতা কেন আরোপ করা হলো, তা আমাদের জানা নেই। তবে গত আগস্টে এনবিআর থেকে যখন এ ধরনের নির্দেশ দেয়া হলো তখন ব্যবসায়ীদের দাবি ও সরকারের সহযোগিতায় সে নির্দেশনা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। আমরা স্থায়ীভাবে এ সমস্যার সমাধান চাই। তাই আমদানি নীতি আদেশে সংশোধন চেয়েছি। সরকারের পক্ষ থেকে সংশোধনের আশ্বাসও পেয়েছি।
এদিকে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির সদস্যদের ৭০ শতাংশ বা প্রায় ৬০০ কারখানার বন্ড লাইসেন্স নেই। বন্ড লাইসেন্স না থাকায় ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র ইস্যু না হলে এসব প্রতিষ্ঠানও বন্ধের শঙ্কা রয়েছে। তাই তারাও আমদানি নীতি আদেশে সংশোধন চেয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিকেএমইএর সদস্য বা নিটওয়্যার পণ্য রফতানির সঙ্গে সম্পৃক্ত শতকরা ৭০ ভাগের অধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা শতভাগ স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহারের মাধ্যমেই তাদের রফতানি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। তাদের মূল্য সংযোজনও শতভাগ। এ অবস্থায় ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলার ক্ষেত্রে বন্ড লাইসেন্স থাকার বাধ্যবাধকতা পোশাক শিল্প খাতে স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল ব্যবহারকে শুধু নিরুৎসাহিতই করবে না, এ দেশের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে ভূমিকা রাখবে। প্রকারান্তরে যা আমদানিকেই উৎসাহিত করবে।
এ প্রসেঙ্গ জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ বণিক বার্তাকে বলেন, বিষয়টি স্থায়ীভাবে সমাধানের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের সভাপতিত্বে একটি কমিটি করে দেয়া হয়েছে। কমিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআরের প্রতিনিধিও রয়েছে। এরই মধ্যে ওই কমিটি একটি মিটিং করেছে। আরো কয়েকটি মিটিং করার দরকার রয়েছে। ওই কমিটি যে সুপারিশ করবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।










