যুক্তরাষ্ট্রের কয়লা রফতানি খাতে সর্বশেষ ২০১৬ সালে মন্দা ভাব দেখা গিয়েছিল। পরের দুই বছর প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে বছর পার করেছে খাতটি। তবে ২০১৯ সালটি মার্কিন কয়লা রফতানিকারকদের জন্য ভালো যায়নি। বছর শেষে দেশটি থেকে জ্বালানি পণ্যটির রফতানি প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কমে গেছে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে ধাতব ও তাপ—দুই ধরনের কয়লা রফতানিই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) দেশটির কয়লা রফতানি খাত নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব মিলিয়ে ৯ কোটি ৩০ লাখ টন কয়লা রফতানি হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে দেশটি থেকে জ্বালানি পণ্যটির রফতানি কমেছে ২০ শতাংশ। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাপ কয়লা রফতানি আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ কমেছে। ধাতব কয়লা রফতানি কমেছে ১২ শতাংশ।
তাপ কয়লা থার্মাল কোল নামেও পরিচিত। মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোয় জ্বালানি হিসেবে এ কয়লা বেশি ব্যবহার হয়। এটি খুব সহজেই চূর্ণ করা যায়। গুঁড়ো মিহি হয়। দ্রুত তাপ উৎপাদন করতে পারে। এ কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানি হিসেবে এ কয়লা ব্যবহার করে। এছাড়াও বিভিন্ন শিল্প-কারখানা ও বাড়িতে এ ধরনের কয়লা ব্যবহার হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মনটানা ও ওমিং অঞ্চলে কয়লাটি সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে উত্তোলন হওয়া মোট কয়লার ৪৪ শতাংশ জোগান দিয়েছে এ অঞ্চলের খনিগুলো। অন্যদিকে ধাতব কয়লার সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে ইস্পাত কারখানাগুলোয়। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপালেচিয়া বেসিনে এ ধরনের কয়লা উত্তোলন বেশি হয়।
ইআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে সবচেয়ে বেশি কয়লা রফতানি হয়েছে। তালিকায় এর পরই রয়েছে যথাক্রমে জাপান, নেদারল্যান্ডস, ব্রাজিল ও দক্ষিণ কোরিয়ার নাম। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে রফতানি হওয়া কয়লার (তাপ ও ধাতব মিলিয়ে) ৫৩ শতাংশের গন্তব্য ছিল এ পাঁচটি দেশ।
ভারতের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতের বড় একটি অংশ কয়লানির্ভর। গত বছর দেশটিতে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৭৫ শতাংশ কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো জোগান দিয়েছে। এসব কেন্দ্রে প্রয়োজন হয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কয়লা। যার ৮৫ শতাংশ নিজস্ব খনিগুলো থেকে উত্তোলন করা কয়লা দিয়ে পূরণ করে ভারত। বাকিটা আমদানি করা হয়। তুলনামূলক কম দাম, নীতিগত ঝামেলা না থাকা, পরিবহনে সহজেই কার্গো পাওয়া—এমন নানা সুবিধার কারণে কয়লা আমদানির ক্ষেত্রে ভারতীয় আমদানিকারকদের প্রথম পছন্দ যুক্তরাষ্ট্র।
ইআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে মার্কিন রফতানিকারকরা ভারতের বাজারে সব মিলিয়ে ৮১ লাখ টন তাপ কয়লা রফতানি করেছেন। আর তাপ ও ধাতব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের বাজারে রফতানি হয়েছে ১ কোটি ২৮ লাখ টন কয়লা। এর মধ্য দিয়ে টানা তিন বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কয়লা রফতানি খাতের প্রধান ক্রেতা হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে ভারত।
জাপানে তাপ ও ধাতব কয়লার ব্যবহার প্রায় সমান। দেশটির ইস্পাত কারখানাগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা কয়লা বেশি ব্যবহার করে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে জাপানে জ্বালানি পণ্যটির রফতানি ২০১৮ সালে একপর্যায়ে অপরিবর্তিত ছিল। যদিও এ সময় জাপানে ইস্পাত উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় ৫ শতাংশ কমে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে রফতানি হওয়া কয়লার তৃতীয় শীর্ষ গন্তব্য নেদারল্যান্ডস। গত বছর মার্কিন রফতানিকারকরা তাপ ও ধাতব মিলিয়ে দেশটিতে মোট ১ কোটি টন কয়লা রফতানি করেছেন। তবে এর পুরোটাই যে নেদারল্যান্ডস আমদানি ও ব্যবহার করেছে, সেটা বলা যাবে না। কেননা নেদারল্যান্ডস ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পণ্য ও জ্বালানি আমদানির অন্যতম প্রাথমিক কেন্দ্র বা হাব। শুরুতে দেশটির বন্দরগুলোয় পুরো বিশ্ব থেকে পণ্য ও জ্বালানি আসে। পরবর্তী সময়ে তা ইইউভুক্ত দেশগুলোয় সরবরাহ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে নেদারল্যান্ডসে রফতানি হওয়া কয়লার ৩০ শতাংশ দেশটি ব্যবহার করেছে। পরিমাণের হিসাবে তা দাঁড়ায় ৩০ লাখ টনে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে কয়লার রফতানি চালানের বড় একটি অংশ নেদারল্যান্ডস হয়ে জার্মানিতে চলে গেছে। ২০১৯ সালে মার্কিন রফতানিকারকরা জার্মানিতে সব মিলিয়ে ৪০ লাখ টন কয়লা রফতানি করেছেন।
বিদায়ী বছরে মার্কিন রফতানিকারকরা ব্রাজিলে ৬৬ লাখ টন কয়লা রফতানি করেছেন বলে প্রতিবেদনে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর বেশির ভাগই ছিল ধাতব কয়লা। অন্যদিকে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে সব মিলিয়ে ৪৭ লাখ টন তাপ কয়লা রফতানি হয়েছে। আগের বছরে এর পরিমাণ ছিল ৬৪ লাখ টন। সেই হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় জ্বালানি পণ্যটির রফতানি কমেছে ১৭ লাখ টন। চলতি বছর শেষেও দুই দেশের কয়লা বাণিজ্যে মন্দা ভাব বজায় থাকার সম্ভাবনা দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। মূলত মাত্রাতিরিক্ত বায়ুদূষণ প্রতিরোধে মাঝারি মানের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে গুটিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে সিউল। এ কারণে দেশটিতে আমদানি করা কয়লার চাহিদাও কমতে শুরু করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় বাজার হারাতে বসেছেন মার্কিন কয়লা রফতানিকারকরা।
তবে পুরনো বাজার হারাতে বসলেও নতুন কিছু বাজার মার্কিন কয়লা রফতানি খাতের সামনে আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। ইআইএর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে মিসরের বাজারে তাপ কয়লা রফতানি আগের বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেড়েছে। মূলত দেশটির সিমেন্ট উৎপাদন শিল্পে মার্কিন কয়লার চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। ফলে দেশটি জ্বালানি পণ্যটির আমদানিও বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে ছোট ছোট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদনে আসায় যুক্তরাষ্ট্রের কয়লা রফতানি খাত মন্দা ভাব কাটিয়ে ওঠার আশার আলো দেখছে।
তবে ইআইএর প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি বছর শেষে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব মিলিয়ে ৬ কোটি ২৭ লাখ টন কয়লা রফতানির সম্ভাবনা রয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩২ দশমিক ১ শতাংশ কম। এমনকি আগামী বছরও এ খাতে মন্দা ভাব বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
মাইনিংডটকম ও এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল অবলম্বনে








