মজুদ হ্রাসের অংশ হিসেবে গত কয়েক বছরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আগামী বছর রফতানি আরো গতিশীল হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো জ্বালানি তেলের নিট রফতানিকারকে পরিণত হতে যাচ্ছে দেশটি, এমনটাই প্রত্যাশা মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কেপলারের।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটির অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি কখনো আমদানিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। প্রতি বছর লক্ষণীয় মাত্রায় রফতানি করলেও চাহিদা মেটাতে এর চেয়েও বেশি আমদানি করতে হচ্ছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র দৈনিক ৩৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্রি করছে। এর মধ্যে গ্যাসোলিন ও ডিজেল জ্বালানির মতো পরিশোধিত পণ্যই রফতানি করা হচ্ছে দৈনিক ৩০ লাখ ব্যারেল করে। এছাড়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রফতানিতেও নেতৃস্থানীয় যুক্তরাষ্ট্র। আগামী বছরগুলোয় পণ্যটি রফতানিতেও উল্লম্ফন দেখা দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে দৈনিক দুই কোটি ব্যারেল করে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ব্যবহার করছে, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। তবে দেশটির উত্তোলন এখন পর্যন্ত দৈনিক ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেলের ঊর্ধ্বে যেতে পারেনি।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি এক উপাত্তে দেখা গিয়েছে, নিট জ্বালানি তেল আমদানি দাঁড়িয়েছে দৈনিক ১১ লাখ ব্যারেলে। এটি ২০০১ সালের পর সর্বনিম্ন। ওই বছর দেশটি রেকর্ড পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করেছিল। এরপর থেকে টানা পাঁচ বছর আমদানিতে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় ছিল। তবে ২০০৬ সালের পর থেকেই আমদানিনির্ভরতা কমানোর চেষ্টা চালাচ্ছে দেশটি।
চলতি বছর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে জ্বালানি তেল রফতানিতে বেশ ভালো সুবিধা পায় যুক্তরাষ্ট্র। পশ্চিমা দেশগুলোর একের পর এক নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়া থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। আবার অনেক ক্রেতা দেশ নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়াতে স্বেচ্ছায় রাশিয়া থেকে আমদানি বন্ধ রাখে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের আমদানি উৎস হিসেবে রাশিয়ার বিকল্প হয়ে উঠতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণে জ্বালানি তেল আমদানি করেছে। ফলে রাশিয়ার পরিবর্তে মার্কিন জ্বালানি তেলের বাজারে নির্ভরতা বাড়ছে ব্লকটির।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী বছর নিট রফতানিকারক হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে উত্তোলন বাড়াতে অথবা কমাতে হবে জ্বালানিটির ব্যবহার। আগামী বছর দেশটিতে পেট্রোলিয়ামের চাহিদা দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে দৈনিক ২ কোটি ৫ লাখ ১০ হাজার ব্যারেলে উন্নীত হতে পারে। সেক্ষেত্রে উত্তোলন ও উৎপাদন অবশ্যই বাড়াতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে সৌদি আরব ও রাশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি জ্বালানি তেল উত্তোলন করছে। আগামী বছর সব মিলিয়ে উত্তোলন দৈনিক ১ কোটি ২৩ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছতে পারে। সেক্ষেত্রে দাম থাকতে হবে অবশ্যই আকর্ষণীয় পর্যায়ে। নয়তো উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ হারাতে পারে।
কেপলার জানায়, রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়ে ইউরোপের পরিশোধন কেন্দ্রগুলো। পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণে জ্বালানি তেল কিনতে শুরু করে তারা। অন্যদিকে এশিয়ার ক্রেতারা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দৈনিক সাড়ে ১৭ লাখ ব্যারেল করে জ্বালানি তেল কিনছে।
এ পরিস্থিতিতে রফতানি টার্মিনালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর জোর প্রয়াস চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। উদ্দেশ্য জায়ান্ট ট্যাংকারগুলোকে ভালো পরিষেবা দেয়া, যাতে সেগুলো ২০ লাখ ব্যারেলেও বেশি জ্বালানি তেল পরিবহন করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের খাতসংশ্লিষ্টরা আগামী বছর দৈনিক এক লাখ ব্যারেল করে রফতানি বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন। তবে বিশ্লেষকদের অভিমত, যদি ২০২৩ সালে বেশির ভাগ দেশ অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে পড়ে, তাহলে নিট রফতানিকারক হয়ে ওঠার এ সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসবে।










