কয়লা রফতানির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা অন্যতম শীর্ষ দেশ। তবে চলতি বছরের শুরু থেকে দেশটির কয়লা রফতানিতে মন্দা ভাব বজায় রয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের মার্চে দেশটি থেকে জ্বালানি পণ্যটির রফতানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১৪ শতাংশ কমে গেছে। দেশটির সরকারি সূত্র সম্প্রতি এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। খবর ড্রাই কার্গো ইন্টারন্যাশনাল নিউজ।
মূলত নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে বিশ্বজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত করে আনা হয়েছে, যা দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কয়লা রফতানিতে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি করেছে। এছাড়া ভাইরাসটির প্রকোপে বৈশ্বিক অর্থনীতির শ্লথতা দেশে দেশে পণ্যটির চাহিদা কমিয়ে এনেছে, যা দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে পণ্যটি রফতানি হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ।
দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ কয়লা রফতানিকারক রিচার্ডস বে কোল টার্মিনাল (আরবিসিটি) থেকে মার্চে সব মিলিয়ে ৫৮ লাখ টন কয়লা আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ শতাংশ বা ৯ লাখ ৫০ হাজার টন কম। এছাড়া ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মার্চ মাসের গড় রফতানির তুলনায় এবার পণ্যটির রফতানি ১২ শতাংশ কমে গেছে।
এ নিয়ে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশটির কয়লা রফতানি কমে ১ কোটি ৬৫ লাখ টনে নেমেছে, ২০১৯ সালের একই সময়ের তুলনায় যা ১ দশমিক ৫ শতাংশ কম।
মার্চের শেষের দিকে এসে দক্ষিণ আফ্রিকার কয়লা রফতানি প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। কভিড-১৯ রোধে গত ২৬ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দেশজুড়ে লকডাউন দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। এর জের ধরে মার্চের শেষ দিকে দেশটি থেকে পণ্যটির রফতানি বন্ধ হয়ে যায়। তবে কয়লা শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের সরকারের কৌশলগত ছাড় দেয়ায় চলতি মাসে দেশটি থেকে পণ্যটির রফতানি পুনরায় শুরু হয়। যদিও তা একেবারে সীমিত পরিসরে। খাতসংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, এ পরিস্থিতি এপ্রিলে দক্ষিণ আফ্রিকার কয়লা রফতানি খাতে আরো নিম্নমুখী প্রবণতা ফেলতে পারে।
লকডাউনের মধ্যেও দক্ষিণ আফ্রিকার কয়েকটি খনি সচল রাখা হয়েছে। এর পরও এ সময় দেশটি থেকে খনিজ পণ্যের সরবরাহ আগের তুলনায় সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। তবে এ পরিস্থিতি দেশটির কয়লা রফতানি খাতে তেমন প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। কারণ লকডাউনের মধ্যেও কয়লা পরিবাহী ট্রেনগুলো দেশটির রিচার্ডস বে কোল টার্মিনালে পৌঁঁছাচ্ছে। কিন্তু রফতানি চাহিদা না থাকায় টার্মিনালটিতে জ্বালানি পণ্যটির মজুদ ক্রমেই বাড়ছে। চলতি সপ্তাহে টার্মিনালটিতে পণ্যটির মজুদ বেড়ে ৪৪ লাখ টন ছুঁয়েছে, আগের সপ্তাহের তুলনায় যা ৮ লাখ ৯০ হাজার টন বেশি। একই সঙ্গে পণ্যটির মজুদের এ পরিমাণ ২০১৯ সালের অক্টোবরের পর থেকে সর্বোচ্চ।
দক্ষিণ আফ্রিকার কয়লা রফতানির অন্যতম শীর্ষ বাজার ভারত। তবে নভেল করোনাভাইরাসের জেরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিও লকডাউনের পথে হাঁটছে। ১৪ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশটির চলমান লকডাউন ৩ মে পর্যন্ত বর্ধিত করেন। এ পরিস্থিতিতে কয়লা আমদানি কমিয়ে দিয়েছে ভারত, যা দক্ষিণ আফ্রিকার রফতানি খাতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
মার্চে রিচার্ডস বে কোল টার্মিনাল থেকে ভারতে মোট ৩৩ লাখ টন কয়লা রফতানি করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা, আগের বছরের একই মাসের তুলনায় যা ২৫ দশমিক ৩ শতাংশ কম। ২০১৯ সালের মার্চে দেশটি থেকে মোট কয়লা রফতানির ৫৬ শতাংশের গন্তব্য ছিল ভারত।
লন্ডনভিত্তিক ব্যবসায়িক তথ্য-উপাত্ত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আরগাস মিডিয়ার সর্বশেষ সিবোর্ন কোল আউনলুকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ভারতের তাপ কয়লা আমদানি দাঁড়াতে পারে ১৭ কোটি টনে, আগের বছরের তুলনায় যা দেড় কোটি টন কম। এ সময় দক্ষিণ আফ্রিকার কয়লা রফতানি আগের বছরের তুলনায় ৫০ লাখ টন কমে ৭ কোটি ১০ লাখ টনে নামতে পারে।
এদিকে চলতি বছরের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্দেশে কোনো কয়লা রফতানি হয়নি, যা মার্চেও অব্যাহত ছিল। টানা তৃতীয় মাসের মতো দেশটি থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় পণ্যটির রফতানি ছিল শূন্য। আগের বছরের মার্চে দেশটি মোট ৩ লাখ ২০ হাজার ১৫৫ টন কয়লা রফতানি করেছিল দক্ষিণ কোরিয়ায়।
তবে এ সময় শ্রীলংকা ও ভিয়েতনামে দেশটি থেকে কয়লা রফতানি বেড়েছে। মার্চে শ্রীলংকায় মোট ৪ লাখ ৯০ হাজার ২৯৭ টন কয়লা রফতানি করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৬৫২ টন বেশি এবং ২০১৮ সালের নভেম্বরের পর থেকে সর্বোচ্চ। একই সময়ে ভিয়েতনামে আগের বছরের মার্চের তুলনায় ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৬৯৪ টন বেড়ে মোট ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৮ টন কয়লা রফতানির রেকর্ড করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা।









