বিশ্ববাজারে বর্তমানে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম কমে তিন বছরের সর্বনিম্নে নেমেছে। নিম্নমুখী দামের সুবিধা নিতে স্পট মার্কেট থেকে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চসংখ্যক এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করছে পেট্রোবাংলা। প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন। জ্বালানি পণ্যের বাজার পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টিগেটিং ডটকমের তথ্যমতে, স্পট মার্কেটে বর্তমানে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি লেনদেন হচ্ছে ৮ ডলার ৩৮-৪০ সেন্টে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২১ সালের মার্চে প্রতি এমএমবিটিইউর দাম সর্বনিম্ন ৭ ডলার ৬০ সেন্টে নেমেছিল।
পেট্রোবাংলার নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে স্পট মার্কেটে যে দামে এলএনজি বিক্রি হচ্ছে, তাতে এ বছর প্রায় দ্বিগুণ বেশি কেনা হবে। এ সময় স্পট মার্কেট থেকে ৪৮-৪৯টি কার্গো কেনার পরিকল্পনা রয়েছে পেট্রোবাংলার। গত বছর কেনা হয়েছিল ২৫টি কার্গো। সে হিসেবে এ বছর ২৩টি কার্গো বেশি কেনা হবে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান খান এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের (পেট্রোবাংলা) বেশি কার্গো কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। আগে ২৫টি ছিল, এখন সেটি ৪৯টি করা হয়েছে। দাম নিম্নমুখী থাকলে ২০২৪ সালে এ পরিমাণ এলএনজি কার্গো কেনা হতে পারে।’
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ বলেন, ‘সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাইরে পেট্রোবাংলা গত বছরের চেয়ে ২৩টি এলএনজি কার্গো বেশি কিনবে। চলতি বছর স্পট মার্কেট থেকে ৪৮টি এলএনজি কার্গো আমদানি করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে আগামী এপ্রিলে পাঁচটি কার্গো আমদানি করা হবে। এর আগে গত দুই মাসে (জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি) সাতটি কার্গো আমদানি করা হয়েছে।’
কভিড-১৯ মহামারীর শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল। প্রতি এমএমবিটিইউর মূল্য ওঠানামা করেছিল আড়াই থেকে ৩ ডলারের মধ্যে। তবে মহামারীর প্রকোপে বিশ্বব্যাপী অচলাবস্থা তৈরি হলে স্পট মার্কেটে পণ্যটির দাম বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম প্রায় ১৪ ডলারে উঠে যায়। এরপর ২০২২ সালের আগস্টে প্রতি এমএমবিটিইউর দাম উঠে আসে ৫৫ ডলারে।
স্পট মার্কেটে অস্বাভাবিক হারে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় ২০২২ সালের দ্বিতীয়ার্ধে এলএনজি আমদানি বন্ধ করে দেয় জ্বালানি বিভাগ। ওই সময় টানা ছয়-সাত মাস স্পট মার্কেট থেকে কোনো এলএনজি কার্গো কেনা হয়নি। আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সে সময় দেশে গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এমনকি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় সারা দেশে ব্যাপকহারে লোডশেডিং হয়। তবে ২০২২ সালের নভেম্বরের পর থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানিটির দাম নিম্নমুখী হতে শুরু করে। ফলে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে আবারো স্পট থেকে আমদানি শুরু করে সরকার। এলএনজির জাপান-কোরিয়া মেকার বা জেকেএম বাজার আদর্শ দাম পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের শুরুতে বাজারদর ৯ থেকে সাড়ে ৯ ডলারে ওঠানামা করেছে। বর্তমানে তা সাড়ে ৮ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।
দেশে জাতীয় গ্রিডে বর্তমানে দৈনিক ২৬৭ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। এর মধ্যে এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে ৬২ কোটি ঘনফুট। জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ দেয়ার সক্ষমতা রয়েছে ১০০ কোটি ঘনফুট। স্পট মার্কেটে পণ্যটির দাম আরো কমে গেলেও এলএনজি বেশি কিনে সরবরাহ বাড়ানোর মতো অবকাঠামো সক্ষমতা নেই পেট্রোবাংলার। দেশে বিদ্যুৎ, শিল্প ও আবাসিকসহ অন্যান্য খাতে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে স্থানীয় উৎস ও আমদানি করে পেট্রোবাংলার ৩০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের জোগান দেয়ার সক্ষমতা রয়েছে। দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতির কারণে পেট্রোবাংলাকে সিএনজি, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতে কোনো না কোনো উপায়ে রেশনিং করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পেট্রোবাংলা স্পট মার্কেটে কার্গো আমদানি বাড়িয়ে গ্যাসের চাহিদা ও জোগানের ঘাটতি কমাতে চায়।










