প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাসের কারণে ভোগ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা চলছে কিছুদিন ধরেই। দামের ওঠানামার কারণে পাইকারি ও খুচরা বাজারে ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ে নাভিশ্বাস উঠেছে। ভাইরাসের সংক্রমণ দীর্ঘদিন বজায় থাকতে পারে, এমন আশঙ্কায় মানুষের মধ্যে মজুদ প্রবণতাও বেড়েছে। আর এর সুযোগ নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। পাইকারি ও খুচরা বাজারে দোকানভেদে একই পণ্যের দামে বিস্তর ফারাক দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাড়তি চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাড়ছে দাম। তবে ক্রেতাদের দাবি, মূল্যবৃদ্ধির এসব ঘটনা পুরোটাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। 

গতকাল চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে মাঝারি মানের মসুর ডাল স্থানভেদে ৭০-৯০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। অথচ পাইকারি বাজারে পণ্যটির দাম ছিল কেজিপ্রতি ৫০-৫৫ টাকা। পাইকারি বাজারে যে মুগ ডাল ১৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেটিই খুচরায় এসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে কেজিপ্রতি ১৬০-১৭৫ টাকায়। 

প্রাণিজ আমিষপণ্যের দামেও একই চিত্র দেখা গেছে। ৬৫ টাকা কেজির এক লিটার তরল দুধ গতকাল সর্বোচ্চ ৯০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা যায়। ব্যবসায়ীদের দাবি, চাহিদা থাকলেও সরবরাহ কমে যাওয়ায় পণ্যটির দাম বাড়তির দিকে রয়েছে। খামারে যেসব ব্রয়লার মুরগি ৮০-৮৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেগুলোই খুচরা বাজারে ১১০-১৩৫ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। খামারে এক ডজন ডিমের দাম ৬০-৬৫ টাকা। খুচরা বাজারে সেই ডিমের দাম উঠেছে ডজনপ্রতি সর্বোচ্চ ১১০ টাকা। 

চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে এদিন প্যাকেটজাত আটা কেজিপ্রতি ৩২-৩৫ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। অথচ প্যাকেটের গায়ে মূল্য লেখা রয়েছে কেজিপ্রতি ৩০ টাকা। ময়দার দামেও জায়গাভেদে ২-৪ টাকা পার্থক্য দেখা গেছে। একই চিত্র দেখা গেছে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, আনারস, আপেলসহ বিভিন্ন মসলা ও ফলের দামে। সবজির বাজারেও একই চিত্র। পাইকারিতে প্রতি কেজি পটোলের দাম ৩৫-৪০ টাকা। খুচরায় বিক্রি হতে দেখা যায় কেজিপ্রতি ৭০ টাকায়। 

খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পর থেকে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না কোপানিগুলো। একই সঙ্গে সরকারি ছুটি বাড়ানো ও আসন্ন রোজার কারণে পণ্য সংকট দেখিয়ে পাইকারি বাজার থেকেই তুলনামূলক বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। এজন্য দামের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে মানুষের মজুদ প্রবণতা প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। তবে পাইকারি ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমানে শ্রমিক ও পরিবহন সংকটে পণ্য সরবরাহ কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে ঠিকই। তবে পাইকারি বাজারে বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগ সঠিক নয়।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তারেকুল হাসান চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সাপ্লাই চেইন গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তবে বিক্রেতাদের মানসিকতাও বাজারে পণ্যের মূল্য নির্ধারণে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। দোকানে দোকানে গিয়ে সঠিক দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে কিনা, সেটা যাচাই করা কঠিন। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো পণ্যের নির্দিষ্ট দাম বেঁধে দিতে পারে। সরকার মনিটরিং জোরদার করতে পারে। তা না হলে বাড়তি দামের বোঝা বহন করতে হবে ক্রেতাদের। 

তিনি আরো জানান, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়ীরা আপত্কালীন এ সময়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবেন, এটা কাম্য নয়। সরকার পণ্য পরিবহনে গাড়ির ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা রাখেনি। সেখানে কেউ যদি ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির জন্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া কিংবা গাড়ি না পাওয়ার কথা বলেন, সেটা আসলে ঠিক না। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের মজুদ প্রবণতায় লাগাম টানা জরুরি বলেও মনে করছেন তিনি।