দেশের শতভাগ রফতানিমুখী কারখানা গ্রামীণ নিটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) ব্যবহার করে সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে একটি চালান খালাস করা হয়েছে। সুতা ঘোষণা দিয়ে আনা এ চালানের আমদানি প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ব্যবহূত নথিতে অসামঞ্জস্যের স্পষ্ট ছাপ দেখা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর পরও তদারকি সংস্থাগুলোর চোখ ফাঁকি দিয়ে বন্দর থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে একটি চক্র পণ্য খালাস করে নিয়েছে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় আসার পর এমভি এলিয়ন নামের জাহাজে থাকা পণ্যের মধ্যে একটি চালানের আইজিএম দাখিল করা হয় ঢাকার ডিইপিজেডে অবস্থিত গ্রামীণ ফান্ডের অর্থায়নে পরিচালিত গ্রামীণ নিটওয়্যারের ঠিকানা। পরবর্তী সময়ে চালানটির পণ্য ছাড়িয়ে নেয়ার পদক্ষেপ হিসেবে যে আগাম পত্র (বিল অব এন্ট্রি) দাখিল করা হয়েছে, তাতেও আমদানিকারক হিসেবে রয়েছে এ প্রতিষ্ঠানের নাম। অথচ আমদানি প্রক্রিয়ার একেবারে শুরুতেই যে আইপি (ইমপোর্ট পারমিট) ব্যবহার করে পণ্য দেশে আনা হয়, সেটি গ্রামীণ নিটওয়্যার লিমিটেডের নামে নয়।

বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অটোমেশন সিস্টেমে যাচাই করে দেখা যায়, আইপিতে সংরক্ষিত তথ্যের মধ্যে গ্রামীণ নিটওয়্যার লিমিটেডের নামে কোনো আইপি ইস্যুই করা হয়নি। অর্থাৎ আমদানি নথিতে যে আইপি (নম্বর : আইবি ২৫০৫২১০১৮৩) দেয়া হয়েছে সেটি জাল ছিল। কাস্টমস নথিতে আইপি অনুযায়ী আমদানিকারক হলো ওয়াইকেকে বাংলাদেশ পিটিই লিমিটেড। শেষ ধাপে অর্থাৎ খালাস পর্যায়েও ওয়াইকেকে বাংলাদেশ পিটিটির নামে জাল নথি তৈরি করে পণ্যের চালান ছাড়িয়ে নেয় প্রতারক চক্র। আইপি, আইজিএম কিংবা খালাস পর্যায়ে বিভিন্ন ধাপে নথিতে ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ ও অসামঞ্জস্যতা থাকলেও তদারকির দায়িত্বে থাকা কোনো সংস্থাই বিষয়টি যাচাই করেনি।

কাস্টমসের একটি সূত্র জানিয়েছে, গ্রামীণ নিটওয়্যারের নামে তৈরি করা বিল অব এন্ট্রিতে রফতানিকারক হিসেবে উল্লেখ রয়েছে চীনের নিংবো টোয়ায় ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট লিমিটেডের নাম। পণ্যের আমদানিতে এলসি খোলা হয়েছে সাউথ ইস্ট ব্যাংক লিমিটেডে। এইচএসকোড-৫৪০২৩৩০০ ব্যবহার করে শুল্কায়ন নথিতে দেয়া পণ্যের বিবরণ হিসেবে ঘোষণা দেয়া আছে পলিয়েস্টার টেক্সচার্ড ইয়ার্ন বা এক ধরনের সুতার।

গ্রামীণ নিটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) ইমামুল হক এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে বড় ধরনের একটি জালিয়াতি সংঘটিত হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। অথচ আমরা এর কিছুই জানতাম না। পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে আসার পর শিপিং এজেন্ট থেকেও আমাদের কোনো নোটিফিকেশন দেয়া হয়নি। আর যে সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য খালাস করে নিয়ে গেছে আমাদের ইমপোর্ট হিস্ট্রিতেও এর সঙ্গে কাজ করার কোনো রেকর্ড নেই। চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে যখন চিঠি পেলাম তখন পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছি এ ধরনের জালিয়াতিতে গ্রামীণ নিটওয়্যার লিমিটেডের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। প্রতারণার বিষয়ে অবগত হওয়ার পর বেপজাতে যোগাযোগ করে দেখি গ্রামীণ নিটওয়্যার এর নামে কোনো আইপি ইস্যু হয়নি। যেখানে আমাদের প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে আইপি (ইমপোর্ট পারমিট) ইস্যু হয়নি, তাহলে আইজিএমে কিংবা আগামপত্রে গ্রামীণ নিটওয়্যার লিমিটেডের নাম কীভাবে আসে, সে প্রশ্নও রাখেন তিনি।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কাস্টমসের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, একে দলিলে একেক রকম তথ্য থাকার পরও প্রতারক চক্র রাজস্ব সুরক্ষার প্রতিটি নিরাপত্তা বেষ্টনী অতিক্রম করে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে চালানটি খালাস করে নিতে সক্ষম হয়েছে। যে প্রক্রিয়ায় চালানটি বন্দর থেকে খালাস হয়ে গেছে, তাতে নথি যাচাইকরণের দুর্বলতা দৃশ্যমান হয়েছে। 

চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, এ অপচেষ্টার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করতে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতারক চক্র আমদানি ডকুমেন্টসে সিল ও স্বাক্ষর জাল করার কারণে আমাদের কর্মকর্তাদের কাছে সংশ্লিষ্ট চালানের ফাইলই আসেনি। সে কারণে যাচাইও করা সম্ভব হয়নি। এতগুলো ধাপ পেরিয়ে কীভাবে চালানটি খালাস করা হলো তা খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে দায়ীদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পদক্ষেপ নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

বন্দর থেকে পণ্যের চালানটি খালাসের আগ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো বিশ্লেষণ করেছে বণিক বার্তা। নিয়ম অনুযায়ী জাহাজ বন্দরে আগমনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আইজিএম দাখিল করেন সংশ্লিষ্ট শিপিং এজেন্ট। এতে দেখা যায়, কাস্টমসের সিস্টেমে চালানটির বিপরীতে শিপিং এজেন্ট হিসেবে আইজিএম দাখিল করেছে সেভেন সিজ ইন্টারন্যাশনাল। আইজিএমে আমদানি হওয়া পণ্যের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, পরিমাণ, মার্কস নম্বর, আমদানিকারক ও রফতানিকারকের নাম ও ঠিকানা সু-স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে এখানে। ফলে পণ্যের প্রকৃত আমদানিকারক ও রফতানিকারক সম্পর্কে নিশ্চিতভাবেই অবগত থাকার কথা শিপিং এজেন্টের। সেভেন সিজ ইন্টারন্যাশনাল আমদানিকারকের পক্ষে মনোনীত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনালকে পণ্য সরবরাহে ডেলিভারি অর্ডার ইস্যু করেছে। 

সেভেন সিজ ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, আমদানিকারকের মনোনীত এজেন্ট হিসেবে প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনাল তাদের সঙ্গে পণ্যের চালানটি খালাসের জন্য যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু এ জালিয়াতির ঘটনার সঙ্গে শিপিং এজেন্ট হিসেবে তাদের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। 

জাহাজ থেকে পণ্য নামানোর পর বন্দর থেকে খালাসের উদ্যোগ হিসেবে আমদানিকারকের পক্ষ থেকে নিযুক্ত হয় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। নথিতে আমদানিকারক হিসেবে উল্লেখিত গ্রামীণ নিটওয়্যার কর্তৃপক্ষ বলছে, চট্টগ্রামে আগ্রাবাদের ৩৪ নূর চেম্বার (চতুর্থ তলা) ঠিকানার সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অর্থাৎ প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনাল তাদের প্রতিষ্ঠানের নামে আগামপত্র দাখিল করেছে । অথচ এ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের সঙ্গে তারা কখনই কাজ করেনি। এমনকি যে রফতানিকারক থেকে পণ্য আমদানি হয়েছে, সেটির সঙ্গেও তাদের বাণিজ্যের কোনো রেকর্ড নেই। 

অন্যদিকে প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে জালিয়াতিতে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে একটি বিবৃতি দেয়া হয়েছে। 

বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া পণ্যের শুল্কায়ন ও সংশ্লিষ্ট দলিলাদি পরীক্ষা করার কাজটি করে মূলত কাস্টমস কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়। কাস্টম হাউজে চালানটির শুল্কায়নে রাজস্ব কর্মকর্তা ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার স্বাক্ষরও রয়েছে। যদিও শুল্কায়ন সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তা ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তারা বলছেন তারা আসলে নথিতে স্বাক্ষরই করেনি। জালিয়াতির একেবারে শুরুর দিকে কাস্টমসের সিস্টেমে একজন রাজস্ব কর্মকর্তার ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে গ্রামীণ নিটওয়্যার লিমিটেডের চালানটি গ্রিন করা হয়েছিল। অথচ এ ঘটনার তিন মাস আগেই ওই রাজস্ব কর্মকর্তা বদলিতে ছিলেন। 

এদিকে প্রতারণার মাধ্যমে শুল্কায়ন হয়ে যাওয়ার পর যখন পণ্যের চালান বন্দর থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়ায় ছিল তখন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও নথি যাচাইয়ে যুক্ত থাকার কথা। খালাস পর্যায়ে বিএল দেখার দায়িত্ব বন্দরের আওতায় পড়ে। পণ্য ছাড়করণের চূড়ান্ত ধাপে বন্দরের দায়িত্বরত কর্মকর্তা কর্তৃক যাচাই হলে কীভাবে পণ্য খালাস হয়ে গেল এর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা চট্টগ্রাম কাস্টমসের পক্ষ থেকে দেয়া চিঠির উত্তরে দিতে পারেনি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।