গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন কমছে আশঙ্কাজনক হারে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) এক জরিপ বলছে, জ্বালানি সংকটের কারণে নিটিং, ডায়িং ও পোশাক শিল্পের উৎপাদন কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। বিকেএমইএ গতকাল এ জরিপের ফল প্রকাশ করেছে।
দেশের নিট পোশাক কারখানাগুলোর এ সংগঠনে সক্রিয় সদস্য কারখানার সংখ্যা প্রায় ৮০০। এর মধ্যে নৈর্ব্যক্তিকভাবে প্রায় ২০ শতাংশ কারখানার ওপর জরিপ চালিয়েছে বিকেএমইএ। এতে দেখা যায়, গ্যাস ও বিদ্যুতের পর্যাপ্ত সরবরাহের অভাবে পোশাকের প্রতিটি প্রক্রিয়াকরণ ধাপে উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। নিটিং বা কাপড় বুনন পর্যায়ে গড়ে ৩৭-৩৮ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ডায়িং শিল্পে। এখানে গড় উৎপাদন কমেছে প্রায় ৫১ শতাংশ। এছাড়া নিট পোশাক শিল্পে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পেছনে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটকেই প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন জরিপকারীরা। ফলাফলে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী কারখানাগুলোর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তাদের দৈনন্দিন উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছে। প্রায় ৭৫ শতাংশ কারখানা সরাসরি গ্যাস সংকটের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য সংকটের কারণে প্রায় ১৪ শতাংশ কারখানার উৎপাদন প্রভাবিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিকেএমইএর সক্রিয় সদস্যরা।
এ সংকট কেবল নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই, বরং দেশের প্রধান প্রধান শিল্প এলাকাগুলোর প্রায় সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী কারখানাগুলোর ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৪৫-৪৬ শতাংশ সাড়া এসেছে নারায়ণগঞ্জ অঞ্চল থেকে। এছাড়া গাজীপুর থেকে ২০ শতাংশ, চট্টগ্রাম থেকে ১৮ ও রাজধানী থেকে ১৩ শতাংশ কারখানা এ জরিপে অংশ নেয়। পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পাঞ্চল থেকেও ৩ শতাংশ সাড়া পাওয়া গেছে।
জ্বালানি সংকটের তীব্রতা মূল্যায়ন করতে গিয়ে দেখা গেছে, স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় গ্যাসের দৈনন্দিন সরবরাহে গড়ে প্রায় ৭৮ শতাংশ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, দৈনিক বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা লোডশেডিংয়ের সময়সীমা আগের তুলনায় গড়ে প্রায় ২০০ শতাংশ বেড়েছে, অর্থাৎ আগের তুলনায় এখন প্রায় তিন গুণ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে।
উৎপাদন হ্রাসের কারণে উদ্যোক্তারা বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব ও ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। তারা বলছেন, জেনারেটরসহ বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে কারখানা সচল রাখতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে প্রায় ৯২ শতাংশ উদ্যোক্তাকে। প্রায় ৯২ শতাংশ কারখানা মালিক জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটে তাদের নিয়মিত কর্মঘণ্টার অপচয় হচ্ছে। সময়মতো পণ্য প্রস্তুত না হওয়ায় প্রায় ৮৭ শতাংশ কারখানা শিপমেন্ট বা সরবরাহ জটিলতায় পড়েছে। এর প্রভাবে প্রায় ৮৯ শতাংশ কারখানা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
জরিপে আরো বলা হয়, সংকটের তীব্রতার কারণে এরই মধ্যে প্রায় ৭৮ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন আংশিক বন্ধ রাখতে বাধ্য হতে হয়েছে। এছাড়া ৭ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য দিতে না পেরে ক্রেতাদের মূল্যছাড় বা ডিসকাউন্ট দিতে বাধ্য হয়েছেন প্রায় ৬০ শতাংশ কারখানা মালিক। ফলে বিশ্ববাজার থেকে প্রায় ৫৫ শতাংশ কারখানার রফতানি আদেশ বাতিল বা হ্রাস পেয়েছে। টানা ব্যবসায়িক ক্ষতি ও উৎপাদন সংকটের মুখে পড়ে প্রায় ৫৯ শতাংশ কারখানা বর্তমানে ব্যাংক ঋণ খেলাপি হওয়ার তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক খাতকেই বড় অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসানের দাবি, প্রায় সব কারখানাই আংশিকভাবে হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘জরিপে আমরা আসল চিত্রটা বের করে আনার চেষ্টা করেছি। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানাতেই উৎপাদন বন্ধ থাকছে।’ তবে এসব কারখানায় যে ক্ষতি হয়েছে, নীতিসহায়তা পেলে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলেও মনে করেন বিকেএমইএর এ নেতা।
বিকেএমইএ আরো জানিয়েছে, ১৩৪টি কারখানার তথ্যের ভিত্তিতে জরিপটি পরিচালনা করা হয়। এতে কারখানার শতাংশ দেখানো হয়েছে, অর্ডার বা আয়ের পরিমাণ নয়। এছাড়া জ্বালানি সংকট ১-২ দিনের মধ্যে সমাধান হলে পরিস্থিতির সঠিক চিত্র পাওয়া যাবে। জরিপে প্রমাণিত হয়েছে, সাময়িক জ্বালানি সংকটে কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি। নীতিগত সহায়তা পেলে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব।










