একসময় বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের অন্যতম ছিল চা। উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি চা বিশ্ববাজারে রফতানি হতো। দেশীয় চাহিদা বৃদ্ধি এবং চাহিদার অনুপাতে উৎপাদন না বাড়ায় ধীরে ধীরে রফতানি পণ্য তালিকার তলানিতে চলে যায় চা খাত। সাম্প্রতিক সময়ে রফতানির পরিমাণ বাড়লেও মানসম্মত রফতানির অতীতে ফিরতে পারছে না চা শিল্প।
২০০১-০২ অর্থবছরেও বাংলাদেশ চা রফতানি করেছিল ১ কোটি ৩৮ লাখ ২ হাজার কেজি। রফতানি কমতে কমতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে নেমে আসে ৪ লাখ ৭৬ হাজার কেজিতে। মাঝে কিছুটা উন্নতি হলেও ২০২১-২২ অর্থবছরে রফতানি কমে ৬ লাখ ৩৯ হাজার কেজিতে নেমে যায়। গত অর্থবছরের ১১ মাসে চা রফতানি বেড়ে হয়েছে ৮ লাখ ২৬ হাজার কেজি। রফতানির পরিমাণ বাড়লেও গুণগত মানের চা রফতানি না হওয়ায় এ খাত থেকে আয়ও কমছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্যে দেখা গেছে, বিদায়ী অর্থবছর রফতানি হওয়া চায়ের গড় মূল্য ছিল কেজিপ্রতি ২ ডলার ২৬ সেন্ট। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চা রফতানি করে বাংলাদেশ আয় করেছিল কেজিপ্রতি ৩ ডলার ৮৭ সেন্ট। ২০১৫-১৬ অর্থবছর কেজিপ্রতি চা রফতানি হয়েছিল ৩ ডলার ২৮ সেন্টে। এমনকি ২০১২-১৩ অর্থবছরেও বাংলাদেশ কেজিপ্রতি চা রফতানি করেছিল ২ ডলার ৪০ সেন্টে। প্রতিযোগিতামূলক চায়ের বৈশ্বিক বাজার ধরতে ব্যর্থতা ছাড়াও ভালো মানের চা উৎপাদনে পিছিয়ে পড়ার কারণে রফতানির পরিমাণ বাড়লেও রফতানি আয়ে পিছিয়ে পড়ছে চা শিল্প।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশীয় চা সংসদের সভাপতি মো. শাহ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশী চায়ের মান যে খুব খারাপ সেটি ঠিক নয়। দেশের ভোক্তারা ভালো মানের চা পান করতে পছন্দ করে। যার কারণে ভালো মানের চা বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর অবিক্রীত চা-ই রফতানি হয়। উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও চায়ের দাম আশানুরূপ না বাড়ায় ভালো মানের চা উৎপাদন চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাগান মালিকরা লাভের ধারায় ফিরলে দেশে ভালো মানের চায়ের পাশাপাশি উৎপাদনের পরিমাণও বাড়বে।’
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০০১-০২ অর্থবছরে চা রফতানি আয় ছিল ১ কোটি ৬৪ লাখ ৬৮ হাজার ডলার। প্রায় দুই দশক আগে রফতানিতে রেকর্ড এ আয়ের পর প্রতি বছরই চা রফতানি কমেছে বাংলাদেশের। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশে চা রফতানিতে আয় হয়েছে ১৯ লাখ ৫৬ হাজার ডলার। বিদায়ী অর্থবছরের ১১ মাসে চা রফতানিতে আয় হয়েছে ১৮ লাখ ৬৯ হাজার ডলার। চা রফতানি লক্ষণীয় মাত্রায় বাড়লেও মানসম্পন্ন চা রফতানি না হওয়ায় আয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশে চা উৎপাদন ও অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় সমান। চাহিদা যেভাবে বাড়ছে সে অনুপাতে উৎপাদন বাড়াতে না পারায় ভালো মানের চা রফতানিতে প্রতিবন্ধকতা দেখছেন উদ্যোক্তারা। এ কারণে প্রায় ১০ কোটি কেজি উৎপাদনের পরও চা আমদানি করতে হয় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে। ব্লেন্ডিংয়ের জন্য ভালো মানের চা আমদানি হওয়ায় নিম্নমানের চা পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ বেশকিছু দেশে রফতানি করেন ব্যবসায়ীরা। যদিও কয়েক বছর ধরে সরকার খাতটিকে সুরক্ষা দিতে চা আমদানির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করেছে। তা সত্ত্বেও আমদানি বন্ধ করেনি কোম্পানিগুলো।
দেশের চা মোড়কজাত ও বাজারজাতকারী শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের মানুষ ভালো মানের চা পান করে। চা মোড়কজাত করতে বৈচিত্র্যময় ও মানসম্মত চায়ের প্রয়োজন হলেও দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন নেই। বিশ্ববাজারে মানসম্মত চায়ের দাম বাংলাদেশের চেয়েও কম। এ কারণে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপের পরও কোম্পানিগুলো বাজারে ভোক্তা চাহিদা ধরে রাখতে আমদানি বন্ধ করেনি। তাছাড়া মুষ্টিমেয় কিছু দেশে বাংলাদেশী ভোক্তাদের চাহিদা মাথায় রেখে বাংলাদেশী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভালো মানের চা রফতানি হলেও সিংহভাগ চা-ই পাকিস্তান-আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্রেতাদের উদ্দেশ্য করে রফতানি করা হয়, যা বিশ্ববাজারে ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে বড় বাধা বলে মনে করছেন তারা।
কিছুদিন আগেও দেশে চা উৎপাদন হতো সাত-আট কোটি কেজির মধ্যে। সর্বশেষ কয়েক বছরে বাংলাদেশ ১০ কোটি কেজির কাছাকাছি চা উৎপাদন করেছে। ২০২২ সালে দেশে চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১০ কোটি কেজি নির্ধারণ করা হলেও সেটি পূরণ হয়নি। চলতি বছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ১০ কোটি ২০ হাজার কেজিতে উন্নীত করা হয়। এ বছরের মে মাস পর্যন্ত দেশে চা উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৫৭ লাখ ১৪ হাজার কেজি, যা ২০২২ সালের একই সময়ের তুলনায় ১২ লাখ ৩৫ হাজার কেজি বেশি। ২০২২ সালের মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে দেশে চা উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৪৪ লাখ ৭৯ হাজার কেজি। ২০২১ সালে উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ২০ লাখ ৬৯ হাজার কেজি। চলতি বছর দেশে চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মাধ্যমে ইতিহাসে রেকর্ড চা উৎপাদন হবে বলে আশা করছেন বাগান মালিকরা।
দেশে উৎপাদিত চায়ের মান অবনমনের জন্য দায়ী করা হয় উত্তরাঞ্চলের সমতলের চা চাষকে। উত্তরাঞ্চলের বিএলএফ চা বা চাষীদের কাছ থেকে পাতা কিনে উৎপাদিত চায়ের মান ভালো না হওয়ায় সামগ্রিক চা খাতই প্রভাবিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব চাষীর নিজস্ব কারখানা কিংবা শ্রমিক না থাকায় ভালো চা উৎপাদনের শর্ত প্রতিপালন করা হয় না। চাষীরা যেকোনো আকারের চা পাতা সংগ্রহ করে বিক্রি করে দেন কারখানা মালিকের কাছে। এসব চায়ের মান ভালো না থাকায় নিলামেও আশানুরূপ দাম পাওয়া যায় না। বর্তমানে দেশে উৎপাদিত চায়ের এক-তৃতীয়াংশই উত্তরাঞ্চলের ক্ষুদ্রায়তন বাগানের হওয়ায় দেশের সার্বিক চা খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন চা-সংশ্লিষ্টরা।










