কুড়িগ্রাম জেলার উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০১৫ সালের ১৫ অক্টোবর একটি জনসভায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ধরলা সেতুর পূর্ব প্রান্তে এবং কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী সড়কের পাশে প্রস্তাবিত কুড়িগ্রাম অর্থনৈতিক অঞ্চল-১-এর জায়গা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এরপর দীর্ঘ আট বছর পেরিয়ে গেলেও অর্থনৈতিক অঞ্চলটি স্থাপনে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
জানা গেছে, অর্থনৈতিক অঞ্চলটি বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত জমিতে স্থানীয় কিছু পরিবার ঘর তুলে বসবাস শুরু করে। দিয়ারা রেকর্ড না থাকলেও ১৯৬২ সালের দলিল অনুযায়ী এসব জমিকে নিজেদের বলে দাবি করে আসছেন সেখানে বসবাসকারীরা। জমির মালিকানা নিয়ে সৃষ্ট এ জটিলতা নিরসন না হওয়ায় অঞ্চলটি স্থাপনের কাজ শুরু করা যায়নি এখনো। যদিও সেখানকার বাসিন্দারা জানান, নিয়ম মেনে ক্ষতিপূরণ দেয়া হলে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে তাদের আপত্তি নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল মিয়া জানান, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য জমি পরিমাপ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত পাঁচ শতাধিক পরিবার বসবাস করছে। অনেকের দিয়ারা রেকর্ড না থাকলেও ১৯৬২ সালের দলিল আছে। তাদের জমি তো সরকারকে কিনে নিতে হবে। আর যাদের দলিল নেই, তাদেরও বাড়িঘর সরানোর জন্য কিছু ক্ষতিপূরণ দেয়া উচিত।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরীফ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বেজা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরকৃত জমির বাইরেও কিছু জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান। এ প্রক্রিয়া শেষ হলেই অবকাঠামোগত উন্নয়ন শুরু হবে।’
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর জমি চেয়ে ২০১৫ সালের ২১ অক্টোবর জেলা প্রশাসনকে চিঠি দেয় বেজা কর্তৃপক্ষ। জেলা প্রশাসন সদর উপজেলার দুটি সম্ভাব্য স্থান নির্বাচন করে বেজা কর্তৃপক্ষের সেই চিঠির জবাব পাঠায় একই বছরের ৩০ নভেম্বর। এরপর সেই বছরের ২৩ ডিসেম্বর প্রাথমিক স্থান কমিটির সভায় কুড়িগ্রাম অর্থনৈতিক অঞ্চল-১-এর জন্য প্রস্তাবিত স্থান হিসেবে মাধবরাম মৌজায় প্রায় ২১৯ দশমিক ৬৪ একর জমি প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালের ১২ এপ্রিল বেজা কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসনকে চিঠি পাঠায়। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২৭ এপ্রিল বেজা কর্তৃপক্ষের কাছে নির্বাচিত জমির দাগ সূচি ও মৌজা ম্যাপ পাঠানো হয় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে। নির্বাচিত এলাকার ২১৯ দশমিক ৬৪ একর জমির মধ্যে ১৪৫ দশমিক ৩০ একর জমি খাস এবং অবশিষ্ট ৭৪ দশমিক ৩৪ একর জমি ব্যক্তি মালিকানাধীন।
এসব জমিতে বসবাসকারীরা দিয়ারা রেকর্ডে না থাকলেও ১৯৬২ সালের দলিল অনুযায়ী নিজেদের জমি বলে দাবি করে আসছেন। যদিও প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জমি অধিগ্রহণকালে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির মূল্য যথাযথভাবে পরিশোধ করা হবে বলে জানিয়েছেন।
এদিকে দীর্ঘদিনেও কুড়িগ্রামে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছে স্থানীয় জনসাধারণ ও ব্যবসায়ী মহল। জেলার ব্যবসায়ীরা জানান, অঞ্চলটি বাস্তবায়ন হলে এখানকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এছাড়া সীমান্তবর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। ফলে সোনাহাট স্থলবন্দর গতি ফিরে পাবে।
কুড়িগ্রামের ব্যবসায়ী মোস্তাফিজার রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কুড়িগ্রাম জেলায় বিসিক শিল্পনগরী ছাড়া আর কোনো কর্মমুখী প্রতিষ্ঠান নেই। সেখানেও বেশির ভাগ প্লটে হাসকিং মিল গড়ে ওঠায় তেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। পাশাপাশি কুড়িগ্রাম টেক্সটাইল মিলটিও অনেক বছর ধরে বন্ধ। বেসরকারিভাবে গড়ে ওঠা একটি স্পিনিং মিলও বন্ধ হয়ে গেছে। যে কারণে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠলে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করতে পারবেন। মানুষেরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।’
কুড়িগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট আব্দুল আজিজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পিছিয়ে পড়া কুড়িগ্রাম জেলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা জরুরি। এটি প্রতিষ্ঠা হলে এ জেলায় ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক উন্নয়ন হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলটি সোনাহাট স্থলবন্দর ও চিলমারী নৌবন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহনে যোগাযোগের সুবিধা পাবে। তাই কৃষিভিত্তিক এ জেলায় ভূমি জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।’










