এক
মাসের ব্যবধানে খাতুনগঞ্জে এলাচের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ১ হাজার টাকা।
সরবরাহ কমে যাওয়া, আমদানি সংকট ও শীতকালীন বাড়তি
চাহিদার কারণে অব্যাহত বাড়ছে মসলাপণ্যটির দাম। এক মাস আগেও
এলাচ পাইকারি পর্যায়ে কেজিপ্রতি বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ২০০
টাকায়। বর্তমানে একই জাতের প্রতি কেজি এলাচের দাম উঠেছে ৩ হাজার ২০০
টাকার ঘরে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে এলাচের বাজার প্রায় শতভাগই আমদানিনির্ভর। সবচেয়ে বেশি এলাচ আমদানি হয় মধ্য আমেরিকার দেশ গুয়েতেমালা থেকে। সর্বশেষ উৎপাদন মৌসুমে দেশটিতে এলাচের বিরূপ আবহাওয়ায় ফলন কমায় দেশটিতে পণ্যটির সরবরাহ কমেছে। অন্যদিকে দেশে চলমান ডলার সংকট, এলসি জটিলতা, বিলাসী পণ্য আমদানিতে শুল্ক বাড়ায় অব্যাহত বাড়ছে পণ্যটির দাম। একসময় প্রতি কেজি এলাচ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় লেনদেন হলেও বর্তমানে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ২০০ টাকায়। সরবরাহ নিশ্চিত না হলে পণ্যটির দাম আর বাড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে ব্যবহারকাল বিবেচনায় বাজারে দুই ধরনের এলাচ বিক্রি হচ্ছে। ২০২২-২৬ সাল মেয়াদি এলাচ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২ হাজার ৩১০ থেকে ২ হাজার ৩২০ টাকায়। অন্যদিকে ২০২৩-২৬ সাল পর্যন্ত মেয়াদি এলাচের দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। এ মেয়াদের এলাচ বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে। আর নতুন মৌসুমে ২০২৪-২৮ সাল মেয়াদি এলাচ আমদানি হওয়ার কথা। তবে এলসি ও ডলার জটিলতায় আমদানি কম হওয়ায় দেশের বাজারে এ মসলাপণ্যের দাম আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
মসলা ব্যবসায়ীরা বলছেন, দুই মাস আগে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হয়েছিল কেজিপ্রতি সর্বনিম্ন ১ হাজার ৪০০ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭০০ টাকায়। তবে দেশের বাজারে চাহিদা অনুপাতে সরবরাহ না থাকা, ব্যাংকে বিলাসী মসলাপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ১০০-১৩০ শতাংশ পর্যন্ত এলসি মার্জিন শর্ত ও ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে চাহিদা অনুপাতে সরবরাহ না থাকায় পণ্যটির দামপ্রতি সপ্তাহেই বাড়ছে। পাশাপাশি একাধিক হাত ঘুরে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানোর ঘটনাও দাম বাড়ায় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগীর আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলাচের বাজার বছরের অধিকাংশ সময়ই স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু এ বছর ডলারসহ বিভিন্ন সংকটে দাম বেড়ে গেছে। আমদানি কম হলে চাহিদার চাপের কারণে পণ্যের দাম স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়।’ তাই আমদানি বাড়লে দামও সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে বলে মনে করছেন তিনি।
দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ। দেশে বিক্রি হওয়া ভোগ্যপণ্যের ৪০-৫০ শতাংশই লেনদেন হয় এ বাজারে। বিশেষ কিছু ভোগ্যপণ্য আমদানিকারকদের মাধ্যমে ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের হাত ঘুরে খুচরা বাজারে প্রবেশ করে। মূলত ট্রেডিং বাণিজ্যে নামমাত্র টাকা জমা দিয়ে ডিও (সরবরাহ আদেশপত্র) স্লিপের মাধ্যমে পণ্যবুকিং দেয়া হয়। এসব ডিও স্লিপ হাত বদল হলে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে এলাচের বাজারে ডিও স্লিপ বাণিজ্য হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
দেশের ঐতিহ্যবাহী ভোগ্যপণ্য বাজার খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, কয়েক বছর আগে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি এলাচের দাম প্রায় সাড়ে ৪ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। ওই সময় আমদানি সংকট, বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে ডিও স্লিপের মাধ্যমে এলাচের দাম বাড়ানো হয়েছিল। বর্তমানেও বিশ্ববাজারে এলাচের দাম বৃদ্ধি ও সংকটের কথা বলে একই ধরনের কৃত্রিম বাণিজ্য হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাচ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য না হওয়ায় প্রশাসনের নজরদারিও থাকে কম। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাজার অস্থিতিশীল করে তোলেন সুযোগ সন্ধানীরা।
মসলা ব্যবসায়ীদের মতে, এলাচের লেনদেন পদ্ধতির সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী (ট্রেডিং ব্যবসায়ী ও ডিও ব্যবসায়ী) শুধু স্লিপ ক্রয়বিক্রয়ের মাধ্যমে পণ্যটির দাম বাড়িয়ে মুনাফা করছে। তবে গত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে গুয়েতেমালা ও ভারতে নতুন মৌসুমের এলাচ উত্তোলন শুরু হয়েছে। নতুন মৌসুমের এলাচ আমদানি হলে বিশ্ববাজারের পাশাপাশি দেশের বাজারেও দাম স্থিতিশীলতায় ফিরবে বলে মনে করছেন তারা।










