দুই ব্যাংকে একই হিসাব বছর এবং একই নিরীক্ষকের প্রত্যয়ন করা ভিন্ন দুটি আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল বস্ত্র খাতের প্রতিষ্ঠান সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড। ভিন্ন দুটি প্রতিবেদনে কোম্পানি আয়, মুনাফা, সম্পদ, আয়করসহ অন্যান্য আর্থিক তথ্যের ক্ষেত্রে ছিল বিশাল ফারাক। এ বছরের মার্চে তদন্ত ও শুনানি শেষে এ ঘটনায় কোম্পানি ও নিরীক্ষককে সতর্ক করে দায়মুক্তি দেয় ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)। অন্যদিকে সম্প্রতি এ ঘটনায় জড়িত নিরীক্ষক রামেন্দ্র নাথ বসাকের নিরীক্ষাচর্চার সনদ (সিওপি) পাঁচ বছরের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)।

সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস ওয়ান ব্যাংকের কাছে জমা দেয়া ২০১৮-১৯ হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদনে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আয় দেখায়। অন্যদিকে আইএফআইসি ব্যাংকের কাছে জমা দেয়া একই হিসাব বছরের আরেকটি আর্থিক প্রতিবেদনে আয় দেখানো হয় ৭৩৪ কোটি টাকা। একইভাবে দুটি আর্থিক প্রতিবেদনে মুনাফা, সম্পদ ও আয়করের তথ্যেও ছিল বিশাল ফারাক। আর এই দুই আর্থিক প্রতিবেদন প্রত্যয়ন করেছেন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের অংশীদার রামেন্দ্র নাথ বসাক।দুই ব্যাংকের কাছে দুই ধরনের আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয়ার বিষয়টি নজরে এলে তা খতিয়ে দেখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এফআরসিকে অনুরোধ জানানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখে দুই প্রতিবেদনের আর্থিক তথ্য ও উপাত্তের মধ্যে ব্যাপক গরমিল খুঁজে পায় এফআরসির অডিট প্র্যাকটিস রিভিউ (এপিআর) বিভাগ। ব্যাংক ও এনবিআরের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নেয়ার জন্য কোম্পানি ও নিরীক্ষক পরস্পরের যোগসাজশে ইচ্ছাকৃতভাবে দুটি নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করেছে বলে এফআরসির পর্যবেক্ষণে উঠে আসে। বিষয়টি এফআরসির পক্ষ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও  বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হয়। পাশাপাশি পেশাদার নিরীক্ষকদের সংগঠন আইসিএবিকেও বিষয়টি জানায় এফআরসি। অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আর্থিক প্রতিবেদন জালিয়াতির বিষয়টি জানানোর পাশাপাশি এ বিষয়ে এফআরসির নিজস্ব কার্যক্রমও চলতে থাকে। কোম্পানির কর্মকর্তার ও নিরীক্ষককে এফআরসির এনফোর্সমেন্ট বিভাগে তলব করা হয়। তারা মৌখিক ও লিখিতভাবে এফআরসির কাছে তাদের বক্তব্য তুলে ধরে। সংশ্লিষ্ট তথ্যপ্রমাণ, এপিআর বিভাগের তদন্ত এবং কোম্পানি ও নিরীক্ষকের বক্তব্য আমলে নিয়ে এ বছরের ২৪ মার্চ আদেশ জারি করে এফআরসি। সংস্থাটির আদেশে কোম্পানি ও নিরীক্ষকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগটি সুনির্দিষ্ট নয় বলে উল্লেখ করা হয়। জালিয়াতির সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়নি বলে কোম্পানি ও নিরীক্ষককে সতর্ক করার পাশাপাশি দায়মুক্তি দিয়ে বিষয়টির নিষ্পত্তি করে এফআরসি। সংস্থাটির আদেশে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এ-সংক্রান্ত আদেশটিকে এ বিষয়ের জন্য পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত বলে বিবেচনা করার কথাও উল্লেখ করা হয়।

জানতে চাইলে এফআরসির এনফোর্সমেন্ট বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ড. আহমেদুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইনানুসারে বিষয়টির নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এ আইনের আওতায় এফআরসির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তবে অন্য কোনো আইনে অন্য কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিলে সে বিষয়ে এফআরসির কোনো আপত্তি নেই।

এফআরসি সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির এনফোর্সমেন্ট বিভাগ থেকে সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস এবং এর নিরীক্ষক রামেন্দ্র নাথ বসাকের বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে সেটি এফআরসির কাউন্সিল সভায় উত্থাপন করা হয়নি। কাউন্সিল সভার এজেন্ডায়ও বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এফআরসির ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্ট মনিটরিং বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ও কাউন্সিলের সদস্য সচিব মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ বিষয়টি বণিক বার্তাকে নিশ্চিত করেছেন। এফআরসির সর্বশেষ কাউন্সিল সভা হয়েছে এ বছরের ২৯ মার্চ। আর সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস এবং এর নিরীক্ষক রামেন্দ্র নাথ বসাকের বিষয়ে দেয়া আদেশে এফআরসির এনফোর্সমেন্ট বিভাগের নির্বাহী পরিচালক স্বাক্ষর করেছেন এ বছরের ২৪ মার্চ। অবশ্য এফআরসির এনফোর্সমেন্ট বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ড. আহমেদুজ্জামান কোম্পানি ও নিরীক্ষকের বিষয়টি কাউন্সিলকে অবহিত করা এবং এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে দাবি করেছেন।

এদিকে এফআরসির কাছ থেকে দুই ধরনের আর্থিক প্রতিবেদন প্রত্যয়ন করার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়ে আইসিএবি এর তদন্ত শুরু করে। সংগঠনটির ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড ডিসিপ্লিনারি কমিটি (আইডিসি) এ বিষয়ে সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের অংশীদার রামেন্দ্র নাথ বসাককে তলব করে। তিনি সংগঠনটির শুনানিতে উপস্থিত হয়ে এ বিষয়ে এফআরসির আদেশের প্রসঙ্গ তুলে ধরে একই বিষয়ে দ্বিতীয় দফায় শাস্তি দেয়ার সুযোগ নেই বলে জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইসিএবি তাদের প্যানেল আইনজীবীদের কাছ থেকে এ বিষয়ে আইনি মতামত নেয়। আইনি মতামতে নিরীক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে সবুজসংকেত পাওয়ার পর গত সপ্তাহের মঙ্গলবার কাউন্সিল সভায় রামেন্দ্র নাথ বসাকের সিওপি পাঁচ বছরের জন্য স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

আইসিএবির সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চাইলে সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের অংশীদার রামেন্দ্র নাথ বসাক এ-সংক্রান্ত চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করে বণিক বার্তাকে বলেন, এফআরসির তদন্তে দুই ধরনের আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয়ার বিষয়টি উঠে আসে। তারা আমাদের শুনানিতে তলব করেছিলেন এবং আমরা যে ব্যাখ্যা দিয়েছি সেটি তারা গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেছেন। এ কারণে এফআরসির পক্ষ থেকে এরই মধ্যে কোম্পানি ও নিরীক্ষককে সতর্ক করে বিষয়টির নিষ্পত্তি করা হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আইসিএবি অযাচিতভাবে আমার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। এ বিষয়ে তিনি আইনি প্রতিকারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানান। আইসিএবির সিওপি লাইসেন্স ছাড়া কোনো নিরীক্ষক কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন প্রত্যয়ন করতে পারবেন না। প্রতি বছর এ সনদ নবায়ন করে থাকে সংগঠনটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষার জন্য সিএ ফার্মগুলোর পুনঃতালিকাভুক্তির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এফআরসির কাছে চিঠি পাঠিয়ে সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের হালনাগাদ তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। এদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নিরীক্ষার জন্য যোগ্য প্রতিষ্ঠানের তালিকায় সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের নাম রয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানটির চারজন অংশীদারের মধ্যে রামেন্দ্র নাথ বসাক অন্যতম। আইসিএবি কর্তৃক তার সিওপি স্থগিত করার তিনি আর্থিক প্রতিবেদন প্রত্যয়ন করা যোগ্যতা হারিয়েছেন।

তালিকাভুক্ত কোম্পানির নিরীক্ষার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, আইসিএবির পক্ষ থেকে যদি আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে আমাদের অবহিত করা হয় তাহলে সেক্ষেত্রে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।