ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো (এসএমই) ক্রমেই ডিজিটাল টুল, নতুন ধরনের পেমেন্ট পদ্ধতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বাড়াচ্ছে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যবসায়িক কার্যক্রম আরো সহজ ও সমন্বিতভাবে পরিচালনা করতে চায় প্রতিষ্ঠানগুলো। সম্প্রতি মাস্টারকার্ডের ‘ড্রিমোনমিকস’ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার তথ্যানুযায়ী, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৭৪ শতাংশ এসএমই তাদের ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। ৬১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান নিয়মিত নতুন ধারণা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। তবে ৬৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ব্যবসার ক্ষেত্রে পূর্বানুমানযোগ্যতা ও স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়। বৈশ্বিক পর্যায়ে এ হার ৬৮ শতাংশ বলে জানিয়েছে মাস্টারকার্ড।

গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, অনেক এসএমই প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি এখন শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর নির্ভর করছে না। বরং বিভিন্ন ডিজিটাল টুল, পেমেন্ট পদ্ধতি ও আর্থিক সম্পর্ককে সমন্বিতভাবে ব্যবস্থাপনা করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। এর লক্ষ্য শুধু দ্রুত নয়, আরো কার্যকরভাবে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেয়া।

মাস্টারকার্ডের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের কমার্শিয়াল অ্যান্ড নিউ পেমেন্ট ফ্লোজ বিভাগের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যানুস্কা ল্যাডস বলেন, ‘ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো পেমেন্টের অবকাঠামো বা অর্থায়নের উৎসের কথা চিন্তা করে না। তারা চিন্তা করে কীভাবে সরবরাহকারীদের অর্থ পরিশোধ করা যায়, নগদ অর্থপ্রবাহ সুন্দরভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায় এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখা যায়।’

তিনি আরো বলেন, ‘আজকের প্রতিটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের সঙ্গে কোনো না কোনো আর্থিক দিক জড়িত থাকে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন পেমেন্ট ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে সত্যিকার অর্থে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’ এর ফলে ব্যবসায়ীরা আরো সহজে কার্যকর মূলধনের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়াতে পারবেন। পাশাপাশি নতুন প্রবণতা ও গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবেন বলেও মনে করেন অ্যানুস্কা ল্যাডস।

বাড়ছে সমন্বিত টুলের চাহিদা

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে গড়ে পাঁচটি ব্যবসায়িক টুল ব্যবহার করে। এর মধ্যে ৯৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান অন্তত এমন একটি ব্যবসায়িক টুল গ্রহণে আগ্রহী, যা তারা বর্তমানে ব্যবহার করছে না। বৈশ্বিক পর্যায়ে এ হার ৮৯ শতাংশ।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব টুল আরো কার্যকরভাবে ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনও বাড়ছে। ৭৪ শতাংশ এসএমই প্রতিষ্ঠান মনে করে, ব্যবসার জন্য সমন্বিত টুল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা ডিজিটাল টুল গ্রহণে আগ্রহী হলেও সেগুলোকে দৈনন্দিন ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ চায়।

পেমেন্ট ব্যবস্থাপনাতেও দেখা যাচ্ছে একই ধরনের জটিলতা। ব্যবসায়িক খরচ মেটাতে এ অঞ্চলের এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে চার ধরনের পেমেন্ট পদ্ধতি ব্যবহার করে। এর মধ্যে ইলেকট্রনিক ব্যাংক ট্রান্সফার ব্যবহার করে ৫৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান, তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ৫৫ শতাংশ, ডেবিট কার্ড ৫২ শতাংশ এবং ক্রেডিট কার্ড ৪৭ শতাংশ।

বিভিন্ন পেমেন্ট পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নমনীয়তা দিলেও একাধিক অ্যাকাউন্ট ও অর্থায়নের উৎস ব্যবস্থাপনার কারণে পরিচালনাগত জটিলতা তৈরি হচ্ছে। হিসাব সমন্বয়েও সময় লাগছে বেশি। এতে নগদ প্রবাহসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঘাটতি, প্রশাসনিক কাজে অতিরিক্ত সময় ব্যয় এবং গ্রাহকসেবা ও ব্যবসার প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বাড়ছে সহজ পেমেন্ট ব্যবস্থার চাহিদা

ভারতেও এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবর্তিত প্রত্যাশার বিষয়টি উঠে এসেছে। দেশটির ৬৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান রিয়েল-টাইম পেমেন্টে আগ্রহী। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এ হার ৫১ শতাংশ। এছাড়া ৪৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান আরো সহজ ডিজিটাল পেমেন্ট সমাধান গ্রহণে আগ্রহী। ৩৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের সুবিধা থাকবে এমন একটি সমন্বিত ক্রেডিট বা ডেবিট ব্যবসায়িক কার্ডে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

এসব চাহিদা বিবেচনায় ভারতে পরীক্ষামূলকভাবে ‘মাস্টারকার্ড ওয়ান ক্রেডেনশিয়াল’ চালু করছে মাস্টারকার্ড ও সিটি ইউনিয়ন ব্যাংক (সিইউবি)। এর মাধ্যমে উপযুক্ত ভোক্তা ও বাণিজ্যিক পেমেন্ট সম্পর্কগুলো একটি একক ক্রেডেনশিয়ালের আওতায় আনার ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে।

ভোক্তা ও এসএমই—উভয়ের জন্য তৈরি এ ব্যবস্থায় একাধিক উপযুক্ত পেমেন্ট সম্পর্ককে একটি মূল কার্ডের সঙ্গে যুক্ত করা যাবে। লেনদেনের পরিমাণ ও মার্চেন্টের ধরনসহ পূর্বনির্ধারিত পছন্দ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট লেনদেন পরিচালিত হবে। এসএমইগুলোর ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক ব্যয় আলাদা রাখার পাশাপাশি পেমেন্টের অর্থায়ন কীভাবে করা হবে, সে বিষয়ে আরো নমনীয়তা দেয়ার লক্ষ্য রয়েছে এ ব্যবস্থার।

সাইবার নিরাপত্তায় বাড়ছে গুরুত্ব

ডিজিটাল কার্যক্রম বাড়ার সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তাকেও ব্যবসার সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলো। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৭০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান মনে করে, সাইবার হুমকি থেকে ব্যবসাকে সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বর্তমানে মাত্র ৩৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান সাইবার নিরাপত্তা টুল ব্যবহার করছে।

মাস্টারকার্ড পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্যবসার দৈনন্দিন কার্যক্রমেও এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। প্রায় চারটির মধ্যে তিনটি বা ৭৪ শতাংশ এসএমই প্রতিষ্ঠান এআইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী। আর্থিক সেবা প্রদানকারীদের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম প্রত্যাশা এআই-চালিত জালিয়াতি শনাক্তকরণ ও নিরাপত্তা সুরক্ষা। এ সুবিধার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ৪৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান।

ডিজিটাল কার্যক্রম বাড়ার সঙ্গে এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থার চাহিদাও বাড়ছে; যা আলাদাভাবে পরিচালনার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে ব্যবহার করা আর্থিক টুলের মধ্যেই সংযুক্ত করা যায়।

মাস্টারকার্ড জানিয়েছে, ‘ড্রিমোনমিকস’ প্রথম প্রতিবেদনটি ২০২৬ সালে ১৮টি দেশের ছয় হাজারের বেশি এসএমই প্রতিষ্ঠানের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। এতে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অস্ট্রেলিয়া, চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার এক হাজারের বেশি উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়িক প্রতিনিধির মতামত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

মাস্টারকার্ড জানিয়েছে, বিশ্বের দুই শতাধিক দেশ ও অঞ্চলে প্রতিষ্ঠানটি ডিজিটাল পেমেন্টের বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে কাজ করছে। মানুষ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারকে ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ দেয়ার পাশাপাশি লেনদেনকে নিরাপদ, সহজ ও সহজলভ্য করার লক্ষ্য নিয়ে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য ও সেবা দিচ্ছে মাস্টারকার্ড।