ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপ বিশ্বজুড়ে চাহিদাকে নিম্নমুখী করেছে। নতুন করে কভিডজনিত বিধিনিষেধ ও তীব্র দাবদাহে ব্যাহত হয়েছে উৎপাদন। চীনের টালমাটাল অর্থনীতি নিম্নমুখী হওয়ার ঝুঁকি আরো জেঁকে বসেছে। নানা প্রতিবন্ধকতায় দেশটির অভ্যন্তরীণ চাহিদায়ও পতন হয়েছে। সব মিলিয়ে গতি হারিয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির বাণিজ্য। গত মাসে দেশটির রফতানি ও আমদানি উভয় বাণিজ্যেই ভাটা পড়েছে। খবর রয়টার্স।

গতকাল প্রকাশিত শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুসারে, আগস্টে চীনের রফতানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। রফতানি প্রবৃদ্ধি জুলাইয়ের ১৮ শতাংশের তুলনায় ধীর হয়েছে। এমনকি রফতানি বাড়ার পরিসংখ্যান বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ১২ দশমিক ৮ শতাংশের চেয়েও অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

চলতি বছর দেশটির রফতানি অর্থনীতির অন্য সূচকগুলোকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তবে এটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান সুদের হার, মূল্যস্ফীতি ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় সৃষ্ট নিম্নমুখী চাহিদার কারণে ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।

বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গুয়োতাই জুনান ইন্টারন্যাশনালের প্রধান অর্থনীতিবিদ জো হাও বলেন, আশঙ্কা করা সময়ের আগেই চীনের রফতানি ধীর হয়ে পড়েছে। কারণ সাম্প্রতিক শিপিং তথ্য থেকে বোঝা যায় যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে চাহিদা এরই মধ্যে কমে গিয়েছে। তাছাড়া জাহাজে পণ্য পরিবহন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।

তিনি মনে করেন, উচ্চ দামের প্রভাব বাণিজ্যকে ব্যাহত করবে। প্রকৃত অর্থে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের শেষ দিক থেকেই আমদানি বাড়ার গতি নেতিবাচক হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ চীনের অভ্যন্তরীণ চাহিদাও নিম্নমুখী রয়েছে।

সম্প্রতি চীনা মুদ্রা ইউয়ানের বিনিময় হার ডলারের বিপরীতে দুই বছরের সর্বনিম্নে দাঁড়িয়েছে। দুর্বল ইয়েনও চীনের রফতানিকে বাড়াতে পারেনি। এটি মূলত বিশ্বজুড়ে চাহিদা দুর্বল হওয়ার চিত্র তুলে ধরছে।

আগস্টে ধীর হওয়ার আংশিক একটি কারণ মূলত গত বছরের শক্তিশালী রফতানি। কভিডের বিপর্যয় কাটিয়ে বিশ্বজুড়ে তুমুল চাহিদার কারণে সে সময় রফতানিতে উল্লম্ফন দেখা দিয়েছিল। তবে নতুন করে সংক্রমণ এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে আরোপিত বিধিনিষেধের কারণেও চীনের রফতানি ধীর হয়েছে। পাশাপাশি তীব্র দাবদাহের কারণে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কারখানাগুলোয় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। রফতানির কেন্দ্র ইয়ু কভিডের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আগস্টের শুরুতে তিনদিনের লকডাউন আরোপ করেছিল। শীর্ষ মৌসুমের সময়ে এমন নিয়ন্ত্রণ আরোপ স্থানীয় পণ্যের চালান ও ক্রিসমাসের পণ্য সরবরাহ ব্যাহত করে।

এদিকে রফতানির চেয়ে আমদানি আরো বেশি ধীর হয়ে পড়েছে। গত মাসে দেশটির আমদানি বার্ষিক মাত্র দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। আগের মাসেও আমদানি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ। আমদানিও বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ১ দশমিক ১ শতাংশের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। আমদানি ও রফতানি উভয়ই গত চার মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন গতিতে বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা, কয়েক দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবদাহ, আবাসন খাতের সংকট ও মন্থর ভোক্তা ব্যয় চীনের আমদানিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। এ অবস্থায় বিশ্বজুড়ে পণ্যের দামও কমতে শুরু করেছে। যদিও কমার গতি ধীর।

বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেট খাতের পরিষেবা সংস্থা জোনস ল্যাঙ ল্যাসালে বলেন, আমদানিতে উল্লেখযোগ্য ধীর হওয়ার বিষয়টি ইঙ্গিত দেয় যে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় খাতটি বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। পাশাপাশি এ পরিস্থিতির শিগগিরই উন্নতি হবে বলেও মনে হয় না। কারণ কভিড প্রাদুর্ভাবের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ও চাহিদা ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ঘাটতিতে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে যুক্ত হয়েছে ডলারের বিনিময় হার বাড়ার চাপ। সব মিলিয়ে আমদানি বিপর্যয়কর পরিস্থিতি পার করছে।

রফতানি ধীর হওয়ায় চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্তও কমে গিয়েছে। গত মাসে দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ৭ হাজার ৯৩৯ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এটি জুলাইয়ে ১০ হাজার ১২৬ কোটি ডলারের তুলনায় অনেক কম।

মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকরা আশা করছেন, চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আগামী কয়েক বছর ধরে অব্যাহত থাকবে। তবে মূল ঝুঁকিগুলো হলো ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও মধ্যমেয়াদে পণ্যের মূল্য।

চীনের সহকারী বাণিজ্যমন্ত্রী লি ফেই বলেন, চীনের বৈদেশিক বাণিজ্য প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। বৈদেশিক চাহিদা দুর্বল হওয়া এটির বড় একটি কারণ।