দেশের ব্যাংকগুলো লম্বা সময় ধরে তীব্র ডলার সংকটে ভুগছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টাকার অবমূল্যায়ন ও রিজার্ভ নিয়ে শঙ্কা। এমন পরিস্থিতিতে সংকুচিত একক গ্রাহক ঋণসীমা নিত্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি প্রবাহকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করছে। হুমকির মুখে পড়েছে শিল্পোৎপাদন ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি একক গ্রাহক ঋণসীমা পুনর্নির্ধারণের অনুরোধ জানিয়ে আসছে। কিন্তু এ বিষয়ে বিভিন্ন সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চিঠি দেয়া হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন সংগঠনসংশ্লিষ্টরা।
২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক একক গ্রাহক ঋণসীমা কমিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর আগ পর্যন্ত একটি ব্যাংক ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড মিলিয়ে একজন গ্রাহককে মোট মূলধনের সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দিতে পারত। নতুন নীতিমালায় এ সীমা পরিবর্তন করে ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি ব্যাংকের বৃহৎ ঋণের পরিমাণও আগের চেয়ে কমানো হয়। গত বছরের ১ এপ্রিল থেকে এসব নির্দেশনা কার্যকর হয়।
ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, যেকোনো সময়ে একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা গ্রুপকে দেয়া ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড ঋণ সুবিধা আসল অংকের মোট পরিমাণ কোনোভাবেই সেই ব্যাংকের মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি হবে না। আর একক কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপকে দেয়া ফান্ডেড ঋণ সুবিধা আসল অংকের মোট পরিমাণ আগের মতোই ব্যাংকের মোট মূলধনের ১৫ শতাংশ অপরিবর্তিত রয়েছে।
এ বিষয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। ১২ নভেম্বর সংগঠনটির সভাপতি মো. হাসান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে লিমিট নির্ধারণ করা হলে পণ্য আমদানি, উৎপাদন ও বাজারজাত প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে। বাজারে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে নিত্যপণ্যও মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখা সম্ভব। বিষয়টি দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্ধারণ করা না গেলে দেশের নিত্যপণ্যের বাজার নতুন করে অস্থিতিশীলতার দিকে যেতে পারে।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই গত ১৬ নভেম্বর একক গ্রাহক ঋণসীমা ও বড় ঋণের সীমা পুনর্নির্ধারণের অনুরোধ জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরকে চিঠি দেয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে ব্যবসায়ীদের আবেদনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে ২০ নভেম্বর একটি চিঠি দেয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও এ বিষয়ে অনুরোধ জানিয়ে আসছে ব্যবসায়ীদের একাধিক সংগঠন। সংগঠনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় চিঠি দেয়া হলেও এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মাহবুবুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একক ঋণগ্রহীতা ও বড় ঋণের সীমা কমিয়ে আনায় চাহিদা অনুপাতে আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। নিত্যপণ্য কিংবা রফতানিমুখী পণ্যের কাঁচামাল আমদানি কমলে পরিশোধন, বাজারজাত ও উৎপাদন পর্যায়ে ব্যয় বেড়ে যায়। পণ্যের দাম বেড়ে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভোক্তারা। ভোজ্যতেল আমদানিকারকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশোধনের জন্য চিঠি দিয়েছি। পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনাকে স্থিতিশীল রাখতে এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত দেয়া উচিত।’
উদ্যোক্তারা বলছেন, ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে প্রতি ডলারের বাংলাদেশী মুদ্রায় মূল্যমান ছিল প্রায় ৮৬ টাকা। চলতি বছরের নভেম্বরে ১ ডলারের বাংলাদেশী মুদ্রায় মূল্যমান দাঁড়ায় প্রায় ১২৫ টাকায়। সে হিসেবে ১ কোটি টাকা ফান্ডেড লিমিট দিয়ে ২০২১ সালের নভেম্বরে একজন ব্যবসায়ী আমদানি করতে পারতেন ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮০ ডলারের পণ্য। ডলারের বিনিময় হার অস্বাভাবিক বাড়ায় বর্তমানে একই পরিমাণ ফান্ডেড লিমিট দিয়ে আমদানি করা যাচ্ছে ৮০ হাজার ডলারের পণ্য। এর ফলে চাহিদার তুলনায় পণ্য আমদানি কমে গেছে। বাজারে তৈরি হয়েছে সরবরাহ সংকট। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দাম। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়া হলে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
জানতে চাইলে দেশের শীর্ষস্থানীয় ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের পরিচালক (করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স) বিশ্বজিৎ সাহা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভোজ্যতেল, চিনি ও গমের মতো নিত্যপণ্য নিয়মিত বিরতিতে আমদানি ও সরবরাহ দেয়া না হলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একক গ্রাহক ঋণসীমা কমানোর কারণে চাহিদামতো ঋণসীমা গ্রহণ করা যাচ্ছে না। ফলে আমদানি ধারাবাহিকতায় বিঘ্ন ঘটছে। ভোজ্যতেল ও চিনির মতো নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় সমস্যা দেখা দিলে আমাদের দেশের মতো প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর দেশের বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। আমরা এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সম্ভাব্য সব পক্ষের কাছেই চিঠি দিয়েছি। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক কেন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছে না, তা আমাদের বোধগম্য নয়।’










