প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে নাব্য সংকটের কারণে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী নৌবন্দরে পণ্যবাহী বড় জাহাজগুলো সরাসরি ভিড়তে পারে না। ফলে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে ছোট ছোট লাইটার জাহাজে করে পণ্য বন্দরে আনতে হয়। এতে লোকসান গুনতে হয় বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীদের। অন্যদিকে বন্দরটি প্রতিষ্ঠার সময় সারসহ অন্যান্য পণ্য খালাসের জন্য চারটি জেটি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় পুরনো ও নড়বড়ে হয়ে জেটিগুলো পণ্য খালাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্ষা মৌসুমে দেশের অন্যান্য নৌবন্দর থেকে নদীপথে সহজে পণ্য আনা গেলেও পর্যাপ্ত জেটির অভাবে দিনের পর দিন খালাসের অপেক্ষায় থাকতে হয় পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে।
সিরাজগঞ্জসহ উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলার সার, কয়লা, নির্মাণসামগ্রী ও জ্বালানি সরবরাহের প্রাণকেন্দ্র বাঘাবাড়ী নৌবন্দর। খুলনা, মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বড় বড় জাহাজে করে এসব প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে এসে বাঘাবাড়ী নদীবন্দর থেকে সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
সাধারণত জাহাজ চলাচলের জন্য স্বাভাবিকভাবে ১০-১২ ফুট পানির গভীরতার প্রয়োজন। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে তা কমে ছয়-সাত ফুটে নেমে আসে। ফলে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে, ক্ষতিগ্রস্ত হন ব্যবসায়ীরা।
সংশিষ্টরা জানান, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নৌযানের আকার ও ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও বাঘাবাড়ী নৌবন্দরে প্রতি বছরই শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেয় নাব্য সংকট। যমুনা নদীর বুকে জেগে ওঠা অসংখ্য ডুবোচরে আটকে পড়ে জাহাজ। এ কারণে পণ্যবাহী বড় জাহাজগুলো সরাসরি বন্দরে পৌঁছতে না পারায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে লাইটারেজে করে পণ্য পরিবহন করে। এতে লোকসান গুনতে হয় বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীদের। অন্যদিকে বন্দরটিতে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করতে অস্থায়ীভাবে বাঁশের চাটাই ও কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি পাটাতন ব্যবহার করতে হয়। এতে অনেক সময় পণ্য নষ্ট হয় ও দুর্ঘটনা ঘটে।
জানা যায়, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ীতে বড়াল নদীর তীরে ১৯৮৩ সালে ৪৭ একর জমির ওপর স্থাপন করা হয় বাঘাবাড়ী নৌবন্দর। দ্বিতীয় শ্রেণীর এ নদীবন্দর ব্যবহার করে বছরে প্রায় তিন লাখ টন সার, কয়লাসহ অন্যান্য পণ্য খালাস করা হয়। এর মধ্যে ইরি-বোরো মৌসুমে বিদেশ থেকে আমদানি করা হাজার হাজার টন ইউরিয়া সার উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার বাফার গুদামে পাঠানো হয় এ বন্দরের মাধ্যমে। এছাড়া এখানে রয়েছে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির মালিকানাধীন জ্বালানি তেলের ডিপো। এখান থেকে উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
বাঘাবাড়ী নৌবন্দরের অবকাঠামোগত অবস্থা খুবই নাজুক। এখানে কোনো শেড নেই। বাফার গুদামগুলো ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক ছোট। যে কারণে হাজার হাজার টন সার খোলা আকাশের নিচে ফেলে রাখতে হয়। বন্দর ইজারা দিয়ে প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করছে সরকার। অথচ প্রতিষ্ঠার ৪১ বছর পার হলেও বন্দরটির অবকাঠামো সংস্কারসহ কোনো উন্নয়ন ঘটেনি। এ কারণে আধুনিক বন্দরের সুবিধাবঞ্চিত বাঘাবাড়ী নৌবন্দর দিন দিন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে। নাব্য সংকট দূর করতে নদী খনন, প্রথম শ্রেণীর বন্দরে উন্নীতকরণসহ আধুনিক সুবিধা দিয়ে বন্দরটি সচল রাখার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বন্দর ব্যবহারকারীরা জানান, দৌলতদিয়া থেকে বাঘাবাড়ী নৌবন্দর পর্যন্ত ৪৫ কিলোমিটার নৌপথের ১১টি পয়েন্টে শুষ্ক মৌসুমে পানির গভীরতা কমে সাত-আট ফুটে নেমে আসে। এছাড়া নৌ চ্যানেল সরু হয়ে যাওয়ার কারণে পণ্যবাহী বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরে প্রবেশ করতে পারে না।
বাঘাবাড়ী বন্দরের ব্যবসায়ী মামা-ভাগনে এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘ডুবোচরে পণ্যবাহী জাহাজ আটকা পড়লে ছোট ট্রলার দিয়ে পণ্য খালাস করতে হয়। এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়। আবার বর্ষা মৌসুমে জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে সমস্যা হয়। দীর্ঘদিন এ অবস্থা থাকলেও এর উন্নয়নে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা নানামুখী সমস্যার মধ্যেই ব্যবসা পরিচালনা করছেন, কিন্তু এভাবে তো চলা যায় না, এ কারণে ব্যবসায়ীদের কাছে ক্রমেই বন্দরটি গুরুত্ব হারাচ্ছে।’
বাঘাবাড়ী বন্দরের দায়িত্বপ্রাপ্ত (বিআইডব্লিউটিএ) সহকারী পরিচালক এসএম আসাদুজ্জামান বলেন, ‘উত্তরাঞ্চলে জ্বালানি তেল ও সার সরবরাহের প্রধান মাধ্যম এ নদীবন্দর। বর্ষা মৌসুমে নদীপথে খুব সহজেই পণ্য আনা যায়।’
তবে খালাসে কিছুটা সমস্যা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জাহাজের স্বাভাবিক চলাচলের জন্য ১০ ফুট গভীরতা প্রয়োজন হয়। বর্ষা মৌসুমে অসুবিধা না হলেও শুষ্ক মৌসুমে পানির গভীরতা কমে গিয়ে বড় জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। তবে বন্দরটি দ্বিতীয় শ্রেণীর ক্যাটাগরিভুক্ত হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী পানির গভীরতা সব সময় ছয়-সাত ফুট রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে নাব্য সংকট দেখা দিলে ড্রেজিং করে বন্দর সচল রাখার চেষ্টা করা হয়।’ এছাড়া বন্দরটি প্রথম শ্রেণীতে উন্নীতকরণ ও নানা সমস্যার কথা উল্লেখ করে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হয়েছে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।










