লুব্রিক্যান্ট বা ইঞ্জিন অয়েলকে শুধু একটি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ পণ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইঞ্জিনের ঘর্ষণ কমানো, গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের কার্যক্ষমতা ধরে রাখা ও জ্বালানি দক্ষতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এর মান গুরুত্বপূর্ণ। মেশিনারিজের ধরন ও প্রস্তুতকারকের সুপারিশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট এসএই গ্রেড ও এপিআই মানের লুব্রিক্যান্ট ব্যবহার করা প্রয়োজন। নিম্নমানের অয়েলে প্রয়োজনীয় সান্দ্রতা বা কর্মক্ষমতা বজায় না থাকলে পিস্টন, সিলিন্ডার ও বিয়ারিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশে ঘর্ষণ বেড়ে যেতে পারে। এতে ধাতব অংশের ক্ষয় দ্রুত হওয়ার পাশাপাশি ইঞ্জিনের আয়ুষ্কালও কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

কিন্তু লুব্রিক্যান্ট এমন একটি পণ্য, যার মানের পার্থক্য সহজে বোঝা যায় না। কারিগরি জ্ঞান সীমিত হওয়ায় অনেক ভোক্তাই ইঞ্জিন অয়েল নির্বাচনে মেকানিক বা ওয়ার্কশপের ওপর নির্ভর করেন। এ সীমাবদ্ধতা ছোট ছোট প্লান্টে নিম্নমানের ও ভেজাল লুব্রিক্যান্ট উৎপাদন ও বাজারজাতের সুযোগ তৈরি করে। ব্যবহৃত ইঞ্জিন অয়েল, নিম্নমানের বেস অয়েল ও এডিটিভ ব্যবহার করে তৈরি এসব পণ্য দীর্ঘমেয়াদে ইঞ্জিন ও যন্ত্রপাতির ক্ষতির পাশাপাশি বৃহত্তর অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

নিম্নমানের বেস অয়েল উচ্চ তাপে দ্রুত কার্যকারিতা হারালে ইঞ্জিন অতিরিক্ত গরম হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। ঘর্ষণ বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি দক্ষতাও কমতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে নিম্নমানের লুব্রিক্যান্ট ব্যবহারে জ্বালানি খরচ ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ইঞ্জিনে স্লাজ বা আঁঠালো গাদ জমে অয়েল ফিল্টার, স্পার্ক প্লাগ, টার্বোচার্জার ও বিভিন্ন সেন্সর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

সমস্যাটি ব্যক্তিগত গাড়িতেই সীমাবদ্ধ নয়, শিল্প-কারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে ব্যবহৃত বড় যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারকের সুপারিশ অনুযায়ী আইএসও মানের লুব্রিক্যান্ট ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় অ্যান্টি-ওয়্যার, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও ডিটারজেন্টের মতো এডিটিভ যথাযথ মাত্রায় না থাকলে যন্ত্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষয় বাড়তে পারে এবং যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ কোনো মেশিন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে শুধু মেরামতের খরচ নয়, বন্ধ থাকে উৎপাদনও। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময়ের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত অচলাবস্থা কোটি টাকার উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। দ্য মোটর অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, ইঞ্জিন অয়েলসহ ভেজাল যন্ত্রাংশ বিশ্বব্যাপী অটোমোবাইল শিল্পকে বছরে ৫৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি ক্ষতির মুখে ফেলে।

সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে গড়ে ওঠা অনুমোদনহীন প্লান্টগুলো ভেজাল লুব্রিক্যান্টের প্রধান উৎস। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর সরকারি অনুমোদন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র কিংবা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড না থাকায় উৎপাদন ও বাজারজাতের ক্ষেত্রে কর, ভ্যাট বা শুল্ক ফাঁকির সুযোগ থাকে। এতে সরকারের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে নিম্নমানের তেলে ইঞ্জিন ও যন্ত্রপাতি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন ইঞ্জিন, যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম আমদানিতে অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পরিবেশগত ঝুঁকি। নিম্নমানের লুব্রিক্যান্ট ব্যবহারে ইঞ্জিনের কার্যকারিতা কমে গেলে পরিবেশে নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার ও সূক্ষ্ম কণার মতো দূষক ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। সেই সঙ্গে মানহীন জ্বালানি তেল পোড়ার ফলে নির্গত ধোঁয়া কারখানার শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

সংকট সমাধানে প্রথমেই অনুমোদনহীন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা প্রয়োজন। লুব অয়েল ব্লেন্ডিং প্লান্ট স্থাপনের সরকারি নীতিমালা অনুসরণ, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, বিএসটিআইয়ের অনুমোদন, ট্রেড লাইসেন্স ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সনদ রয়েছে কিনা, তা যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি নিম্নমানের বেস অয়েল ও এডিটিভের সরবরাহ নেটওয়ার্কও ভেঙে দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড ও ডিস্ট্রিবিউটরদের উচিত নিজস্ব সরবরাহ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পণ্য সরাসরি খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা। যাতে মাঝপথে ভেজাল মেশানোর সুযোগ না থাকে। তবে শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ভোক্তা সচেতনতাও। গাড়ির মালিককে নিজের গাড়ির জন্য নির্ধারিত এসএই গ্রেড ও এপিআই শ্রেণী সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে এবং প্রস্তুতকারকের নির্দেশ অনুযায়ী জ্বালানি নির্বাচন করতে হবে। পণ্যের সিল, প্যাকেজিং ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য যাচাইয়ের পাশাপাশি সম্ভব হলে কিউআর কোড, স্ক্র্যাচ কার্ড বা সিকিউরিটি সিলের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা উচিত। অনুমোদিত ডিলার বা বিশ্বস্ত বিক্রয় কেন্দ্র থেকে পণ্য কেনা এবং ক্যাশ মেমো বা রসিদ রাখা জরুরি।