আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম এখন কমতির দিকে। চার সপ্তাহ ধরে নিম্নমুখী প্রবণতা যাচ্ছে পাম অয়েলের বাজারে। তবে তার কোনোই প্রভাব নেই দেশের বাজারে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মাসেই ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয়ের কথা থাকলেও তিন মাস ধরে দেশে অপরিবর্তিত পণ্যটির দাম। এতে বিশ্ববাজারে দাম কমার কোনোই সুফল পাচ্ছেন না দেশের ভোক্তারা।

সর্বশেষ বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন গত ১৪ সেপ্টেম্বর সয়াবিনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা এবং পাম অয়েলের দাম লিটারপ্রতি ৪ টাকা কমিয়েছিল। এর তিনদিনের মাথায় ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ওই মূল্য কার্যকর করা হয়।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বোতলজাত সয়াবিনের দাম লিটারপ্রতি ১৭৪ টাকা থেকে কমে ১৬৯ টাকা, পাম অয়েলের দাম লিটারপ্রতি ১২৮ টাকা থেকে কমে ১২৪ টাকায় নামানো হয়। এর আগে প্রায় প্রতি মাসেই ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ করলেও সেপ্টেম্বরের পর এখনো আর কোনো নতুন দর নির্ধারণ করা হয়নি।

এরই মধ্যে কয়েক মাস ধরে দেশের পাইকারি বাজারগুলোয় ভোজ্যতেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায়ই স্থিতিশীল। অর্থাৎ দাম বেড়ে যাওয়ার পর আর কমেনি। বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) পাম অয়েল লেনদেন হচ্ছে (ডিও স্লিপ পর্যায়ে) ৪ হাজার ৬০০ থেকে ৪ হাজার ৬৫০ টাকায়। অন্যদিকে সয়াবিন লেনদেন হচ্ছে মণপ্রতি ৫ হাজার ৮৮০ থেকে ৫ হাজার ৯০০ টাকার মধ্যে। মিলগেট থেকে সংগ্রহ পর্যায়ে এসব পাম অয়েল কিংবা সয়াবিনের দাম মণপ্রতি আরো ২৫০-৩০০ টাকা বেড়ে যায়। বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের বর্তমান বা গত কয়েক মাসের দামের সঙ্গে তুলনা করলে এ দাম অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মওলা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগে প্রতি মাসেই ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয় হলেও এখন সেটি অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। এ কারণে বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশের সাধারণ ব্যবসায়ী ভোক্তারা এ দামের সুফল নিতে পারছে না। আমরা এ বিষয়ে বিভিন্ন ফোরামে বলে আসছি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত অতি নিত্য ভোগ্যপণ্য হিসেবে ভোজ্যতেলের দাম কমাতে শুল্ক ছাড়সহ বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করা।’

এদিকে আমদানিকারকরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে দেশে ডলারের দাম ছিল ৯০ টাকারও কম। বর্তমানে দফায় দফায় ডলারের দাম বেড়ে কিংবা টাকার অবমূল্যায়ন হয়ে প্রতি ডলারের খরচ ১২৭ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। এ কারণে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম কমলেও ডলারের বিপরীতে টাকায় হিসাব করলে দামে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসছে। তাছাড়া ডলার সংকট, এলসি মার্জিন বেশি হওয়ায় চাহিদামতো আমদানিও কমে গেছে। ছোট ছোট এলসি খোলার কারণে আমদানি খরচ বেড়েছে। চলমান সংকট অব্যাহত থাকলে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলসহ পণ্যমূল্যের দাম কমলেও ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সুফল পাওয়া অনিশ্চিতই থেকে যাবে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ভোজ্যতেল আমদানিকারক, পরিশোধন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের পরিচালক (করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স) বিশ্বজিৎ সাহা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা দাম সমন্বয়ে আগ্রহী। তবে ডলারের যে পরিমাণ দাম বেড়েছে, তাতে বিশ্ববাজারে দাম কমলেও সমন্বয় করলে বর্তমানে বিক্রি হওয়া দামের চেয়ে কম হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এর পরও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণে সবসময় আগ্রহী।’

বিশ্বব্যাংকের কমোডিটিজ প্রাইজ ডাটা অনুযায়ী, সর্বশেষ নভেম্বরে অপরিশোধিত পাম অয়েল বিক্রি হয়েছে গড়ে টনপ্রতি ৮০৪ ডলার। ২০২০ সালে পাম অয়েলের টনপ্রতি গড় দাম ছিল ৭৫২ ডলার। অর্থাৎ বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত পাম অয়েলের দাম ২০২১ সালের চেয়েও কম, প্রায় ২০২০ সালের সম পর্যায়ে নেমেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সংকট, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ছাড়াও সময়মতো দাম সমন্বয়ের অভাবে প্রধান ভোজ্যতেলের দাম কমেনি। অন্যদিকে সর্বশেষ নভেম্বরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত সয়াবিনের দাম ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ১৩৪ ডলার। ২০২১ সালে সয়াবিনের বুকিং দাম ছিল গড়ে ১ হাজার ৩৮৫ ডলার এবং ২০২০ সালে ৮৩৮ ডলার। সয়াবিনের দাম ২০২১ সালের তুলনায় ২৫০-৩০০ ডলার কম হলেও দেশের বাজারে তার কোনো প্রভাব পড়েনি।

ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয়ে বিলম্বের বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষকে পাওয়া যায়নি। তবে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান মো. ফয়জুল ইসলামের কাছে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

করোনাকালীন সংকটের পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। বিশ্ববাজারে পণ্যটির সরবরাহ সংকট, বুকিং দর বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে এর প্রভাব পড়ে। বোতলজাত সয়াবিনের দাম বাড়তে বাড়তে এক পর্যায়ে দেশের ইতিহাসে রেকর্ড লিটারপ্রতি ২০৭ টাকায় উঠে যায়। যদিও বিশ্ববাজারে ধারাবাহিক দরপতনের পরিপ্রেক্ষিতে সয়াবিনের দাম লিটারপ্রতি কমে বর্তমানে ১৬৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে (সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য)।

জানা গেছে, ভোজ্যতেল আমদানিতে কোম্পানিগুলোকে সর্বমোট ৩৫ শতাংশ কর দিতে হয়। শতাংশের হিসাবে শুল্ক নির্ধারিত হওয়ায় ডলারের মূল্য বৃদ্ধিজনিত কারণে শুল্কের হারও বেড়ে যায়। প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন কিংবা পাম অয়েল আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট দিতে হয় ১৫ শতাংশ, উৎপাদন পর্যায়ে ১৫ এবং বিক্রয় পর্যায়ে ৫ শতাংশ। এর আগে ভোজ্যতেলের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি রোধ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) শুল্কছাড় দিলেও বর্তমানে তা কার্যকর নেই।

প্রসঙ্গত, ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণে ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদনের পর সেটি ট্যারিফ কমিশনের নির্দিষ্ট শাখা পর্যালোচনা করে একটি মতামত দেয়। আমদানি তথ্য, বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম, বন্দর থেকে খালাসের সময়সহ বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে আমদানিকারক, ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের লাভ হিসাব করে একটি যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করা হয়। দামটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ আকারে পাঠানো হলে মন্ত্রণালয় থেকে চিঠির মাধ্যমে রিফাইনারি মালিকদের জানিয়ে দেয়া হয়।