নির্মাণকাজের ভরা মৌসুম শীতকাল এগিয়ে আসায় নির্মাণ উপকরণ রড ও সিমেন্টের চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। কিন্তু
জ্বালানি তেল ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে একই সঙ্গে উদ্বেগ বাড়ছে নির্মাণ খাতে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের সরবরাহ সংকটে এমনিতে কয়েক দফা বেড়েছে রডের দাম। মূল্যবৃদ্ধির এ প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি খাতে বাড়ি নির্মাণকারী, আবাসন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণকাজে সংশ্লিষ্টদের বেশ চিন্তায় ফেলেছে।
খুচরা বাজারে গতকাল ভালো মানের প্রতি টন রড বিক্রি হয়েছে গড়ে ৭৯ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকায়। আর ডিলার পর্যায়ে পাইকারিতে ইস্পাতের বাজারে নেতৃত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিএসআরএম, আবুল খায়ের গ্রুপ, কেএসআরএম, জিপিএইচ ইস্পাত, মোস্তফা হাকিম গ্রুপ, বায়েজিদ স্টিলের ভালো মানের রড গতকাল কোম্পানিভেদে বিক্রি হয়েছে গড়ে ৭৬ হাজার থেকে ৭৮ হাজার টাকার মধ্যে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পাইকার পর্যায়েই টনপ্রতি রড ৮০ হাজার টাকা ছাড়াবে বলে জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন ডিলার। শুধু গত ১০ দিনের ব্যবধানে ভালো মানের রডে টনপ্রতি প্রায় ৫ হাজার টাকা বেড়ে এখন প্রায় ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ইস্পাত খাতের উদ্যেক্তারা বলছেন, গত নভেম্বর থেকে বিশ্ববাজারে রড তৈরির কাঁচামালের দাম বেড়েছে। এর সঙ্গে দেশের বাজারেও কয়েক দফা বেড়েছে রডের দাম। কাঁচামালের দাম বাড়তে থাকায় মূলত রডের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এখন নতুন করে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ইস্পাত পণ্যের মূল্য আরো বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তারা।
বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধিতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এখন ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি নির্মাণসামগ্রীর বাজারকে আরো অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেবে। কারণ বন্দরের জেটি থেকে কারখানা পর্যন্ত কাঁচামাল পরিবহন করে নিয়ে আসা আবার পণ্য প্রস্তুত করে গন্তব্যস্থলে পৌঁছানো উভয় দিকের পরিবহন ডিজেলনির্ভর। এতে দাম না বাড়িয়ে উপায় থাকবে না।’
কেএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার জাহান রাহাত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোম্পানিগুলো উৎপাদন খরচের চেয়ে এখনো কম দামে রড বিক্রি করছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি খাতটিকে আরো অস্থির করে তুলবে।’
বিশ্ববাজারে সিমেন্ট তৈরির প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকারের দাম বেড়ে যাওয়ায় গত মার্চে এক দফায় দাম বাড়িয়েছিলেন খাতটির উদ্যোক্তারা। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে বর্তমানে ক্লিংকার ও প্রস্তুত সিমেন্টের পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দাম বাড়ানোর আভাস মিলছে সিমেন্ট খাতেও। দেশের বাজারে বর্তমানে নির্মাণ পণ্যটির দাম ৪০-৫০ টাকা বেড়ে কোম্পানিভেদে প্রতি বস্তা সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত।
বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) সভাপতি ও ক্রাউন সিমেন্ট কংক্রিট অ্যান্ড বিল্ডিং প্রডাক্টস লিমিডেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলমগীর কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিতে বেকায়দায় আছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। এখন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিশ্চিতভাবেই উৎপাদন খরচ আরো বাড়িয়ে দেবে।’
মেট্রোসেম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিসিএমএর প্রথম সহসভাপতি মো. শহিদুল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চাহিদা বাড়ছে কিন্তু কাঁচামাল সরবরাহ নিয়ে বেগ পেতে হচ্ছে। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি সিমেন্ট নির্মাতাদের আরো সমস্যায় ফেলে দিল।’
এদিকে গত কয়েক দিনের ব্যবধানে নির্মাণের প্রধান উপকরণ রডের দাম বাড়ায় আবাসন খাতের ব্যবসায়ী ও নির্মাণাধীন বাড়ির মালিকরা চিন্তায় পড়ে গেছেন। যশোর শহরের বৃহৎ রডের দোকান ইমান আলী অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী আকতার হোসেন জানান, সব কোম্পানির রডের দাম কেজিতে গত এক মাসের ব্যবধানে ১০ টাকা বাড়িয়েছে। ক্রেতারা অভিযোগ করছেন, বাজারে চাহিদা বেশি থাকায় সংকট তৈরি করে বেশি দাম হাঁকা হচ্ছে।
যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান খান জানান, বর্তমানে রডের উৎপাদনের চেয়ে বাজারে চাহিদা বেশি রয়েছে। কোম্পাানি মালিকদের কাছ থেকে ব্যবসায়ীদের বেশি দামে রড কিনতে হচ্ছে। যে কারণে ব্যবসায়ীরাও বেশি দামে এসব সামগ্রী বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।










