বৈশ্বিক মহামারীর সংক্রমণ রোধে গত মাসে ভারতে শুরু হয়েছে দেশব্যাপী ২১ দিনের লকডাউন। এ পরিস্থিতিতে খুব জরুরি প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ব্যতীত দেশটির সব ধরনের শিল্প খাতের কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বাদ যায়নি দেশটির চিনি শিল্পও। লকডাউনে সরবরাহ লাইন ব্যাহত হওয়ায় এরই মধ্যে দেশটির অভ্যন্তরীণ পাইপলাইনে ১৫ লাখ টনের মতো চিনি আটকে আছে। শুধু উৎপাদন কার্যক্রম নয়, নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে পণ্যটির চাহিদা ও সরবরাহের ওপর। সেই সঙ্গে রফতানি খাতেও। খবর বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।

লকডাউনে ভারতের রেস্টুরেন্ট, মিল থেকে শুরু করে সিনেমা হল পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে। ফলে আইসক্রিম, পানীয়, জুস, কনফেকশনারি এবং মিষ্টান্ন দ্রব্য সবকিছুর চাহিদায় মন্দা নেমেছে। যার প্রভাব পড়েছে চিনির বাজারে। এদিকে শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারই নয়, একই অবস্থা বিদ্যমান আন্তর্জাতিক বাজারেও। চাহিদা কমায় নিম্নমুখী রয়েছে মিষ্টিপণ্যটির দামও। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রুপির অবমূল্যায়নের জেরে ভারতের বাজারে চিনির রফতানি মূল্য কমে গেছে, যা পণ্যটির আমদানিকারকদের আকর্ষণ জোগাতে পারে বলে মনে করছে ইন্ডিয়া সুগার মিলস অ্যাসোসিয়েশন (আইএসএমএ)। প্রতিষ্ঠানটি প্রত্যাশা করছে, এ সুযোগে আগের ক্ষতি অনেকটা পুষিয়ে উঠতে পারবে খাতসংশ্লিষ্টরা।


ভারতের অন্যতম বৃহৎ চিনিকল সিম্ভলি সুগারস লিমিটেডের বাসুদেব ব্যানার্জি বলেন, লকডাউনের পর থেকে এরই মধ্যে দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে চিনির চাহিদা আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির রফতানির ক্ষেত্রেও নানা ধরনের বাধা রয়েছে। সহসাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পথ দেখছেন না তিনি। লকডাউন উঠে গিয়ে পণ্যটির সরবরাহ চক্র স্বাভাবিকে ফিরলে তবেই শিল্প খাতটিতে চাঙ্গা ভাব ফিরতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

তবে এ দুর্দিনের মধ্যে ভারতের চিনি রফতানি খাতে আশার আলো দেখাচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার বাজার। দেশটি ভারত, থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া থেকে চিনি আমদানিতে পক্ষপাতমূলক আমদানি শুল্ক কমিয়ে এনেছে। ইন্দোনেশিয়ার এ সিদ্ধান্ত ভারতের রফতানিকারকদের অনেকটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। 

অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ইন্দোনেশিয়া প্রতি বছর প্রচুর চিনি আমদানি করে। তবে দেশটির মোট আমদানীকৃত চিনির ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ থাকে থাইল্যান্ডের। মাত্রাতিরিক্ত খরায় এবার থাইল্যান্ডের চিনি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। চলতি মৌসুমে আগের মৌসুমের তুলনায় দেশটিতে পণ্যটির উৎপাদন ৬৫ লাখ টন কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এছাড়া আগামী মৌসুমে দেশটিতে পণ্যটির উৎপাদন আরো ১০ লাখ টন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ইন্দোনেশিয়ার ব্যবসায়ীদের পণ্যটি আমদানিতে ভারতসহ অন্যান্য দেশের প্রতি ঝুঁকিয়ে দিয়েছে।

আইএসএমএর এক নোটে বলা হয়েছে, মোট চিনি আমদানি চাহিদা পূরণ না হওয়ায় থাইল্যান্ডের বাইরে অন্যান্য শীর্ষ রফতানিকারক দেশের প্রতি নজর দেবে ইন্দোনেশিয়া, যার বড় একটা অংশ আসবে ভারতের দিকে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশটি থেকে রফতানি শুরু হলেও আগামী জুনে ইন্দোনেশিয়ার বাজারে পণ্যটির রফতানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে বলে প্রত্যাশা করছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে লকডাউনের সময় অন্যান্য দেশে চিনি রফতানি কমে গেলেও আংশিক বা বৃহত্তর অর্থে ভারতের ক্ষতিপূরণ হতে পারে ইন্দোনেশিয়ার দ্বারা।

আইএসএমএর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে চিনির উৎপাদনের পরিসংখ্যানও প্রকাশ করা হয়েছে। তথ্যমতে, চলতি বছরের শুরু থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত দেশটিতে মোট ২ কোটি ৪৭ লাখ ৮০ হাজার টন চিনি উৎপাদিত হয়েছে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ২০ শতাংশ কম। ২০১৯ সালের একই সময়ে দেশটি মোট ৩ কোটি ১১ লাখ ৮০ হাজার টন চিনি উৎপাদন করেছিল। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে ভারতে কৃষিপণ্যটির উৎপাদন ৬৪ লাখ টন কমেছে। 

ভারতের উত্তর প্রদেশে সবচেয়ে বেশি চিনি উৎপাদন হয়। চলতি বছরের শুরু থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত উত্তর প্রদেশের চিনিকলগুলো উৎপাদন করেছে মোট ১ কোটি ৮ লাখ ৩০ হাজার টন। আগের বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৫ লাখ ৬০ হাজার টন। চলতি মাসের শেষ নাগাদ রাজ্যটির মোট ১১৯টি চিনিকল বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছে আইএসএমএ। একই সময়ে পণ্যটির দ্বিতীয় শীর্ষ উৎপাদনকারী রাজ্য মহারাষ্ট্রের চিনিকলগুলো উৎপাদন করেছে ৬০ লাখ টনের কিছু বেশি চিনি। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১ কোটি ৬ লাখ ৭০ হাজার টন। একই অবস্থা বজায় রয়েছে বাকি রাজ্যগুলোতেও।