বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের মধ্যে (বিসিক) যে ৭৯টি শিল্পনগরী আছে তার মধ্যে অন্যতম চট্টগ্রামের কালুরঘাট বিসিক শিল্পনগরী। ১৯৮০ দশকের শুরুর দিকে এ শিল্পনগরীর গোড়াপত্তন হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে কারখানা পরিচালনা করতে না পেরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে সম্প্রতি বন্ধ হয়ে যাওয়া রুগ্ণ কোম্পানিগুলো বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর নতুন মালিকানায় আসায় কর্মচাঞ্চল্য ফিরতে শুরু করেছে কালুরঘাট বিসিক শিল্পনগরীতে।
বিসিক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, কালুরঘাট সেতু ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের কারণে কালুরঘাট বিসিকে নতুন করে বিনিয়োগের চিন্তাভাবনা করছেন ব্যবসায়ীরা। চট্টগ্রাম নগরীর জমির মূল্য অতিরিক্ত হওয়ায় কালুরঘাট বিসিকের প্লটের দিকে নজর দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
কালুরঘাট বিসিক শিল্পনগরীর তথ্যমতে, চট্টগ্রাম কালুরঘাট ভারী শিল্প এলাকায় ১৯৬০ সালের দিকে অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে গোড়াপত্তন হলেও ১৯৮০ সালের দিকে চালু হয় শিল্পনগরীটি। তখন বিসিক শিল্প এলাকায় ৭১টি প্লটে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তী সময়ে বিসিকের চাহিদা বাড়তে থাকায় কালুরঘাট বিসিক শিল্পনগরী সম্প্রসারণ করে বিসিক। ১৯৯০ সাল-পরবর্তী সময়ে ২৫৫টি প্লটে ১২৮টি প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে এ শিল্পনগরীতে ১৫৭টি প্রতিষ্ঠান থাকলেও চালু আছে ১৩৩টি। ২৪টি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে।
এদিকে কালুরঘাট বিসিকের কারখানা বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি বেশ কয়েকটি বড় শিল্প গ্রুপ রুগ্ণ কারখানার মালিকানা হাতবদল করে কারখানা সংস্কার করছে। উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করবে বছরখানেকের মধ্যেই। এমনকি বন্ধ হয়ে থাকা পোশাক খাতের অন্তত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান আবারো চালুর পথে আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাংলাদেশ সরকারের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খানের মালিকানাধীন ওষুধ কোম্পানি থেরাপিউটিকস বাংলাদেশ লিমিটেড। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলেও ২০২১ সালে ৮৩ হাজার বর্গফুট আয়তনের কারখানাটি অধিগ্রহণ করে টিকে গ্রুপ। বর্তমানে কারখানাটির অবকাঠামোগত সংস্কারকাজ চলছে।
এদিকে কালুরঘাটে বন্ধ থাকা ১২ হাজার বর্গফুটের ইফকো গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেড অধিগ্রহণ করেছে মোস্তফা গ্রুপ। জেমস প্যাকও অধিগ্রহণ করেছে মোস্তফা গ্রুপ। সর্বশেষ চয়েস ওয়াশিং কারখানা অধিগ্রহণ করে অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ করছে টপ স্টার ফ্যাশন লিমিটেড নামের একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এদিকে সিএনএ গ্রুপের পাঁচ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ থাকলেও তারাও নতুন করে উৎপাদনে আসার জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাজ শুরু করেছে। এ গ্রুপের পাঁচ প্রতিষ্ঠান সিএনএ ফ্যাশন, সিএনএ ফ্যাব্রিকস, সিএনএ অ্যাকসেসরিজ, সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল ও নিট অ্যাকসেসরিজ। এ গ্রুপের ৮১ হাজার ৯৯০ বর্গফুট জায়গাটি অধিগ্রহণ সূত্রে দখলে আছে। সম্প্রতি গ্রুপটির নামে বরাদ্দ থাকা ৬৪ থেকে ৬৮ ও ৭২ এবং ৭৩ নম্বর প্লটে থাকা কারখানা চালুর উদ্দেশ্যে সংস্কারকাজ শুরু করেছে।
টপ স্টার গ্রুপের বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আশিষ দাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টপ স্টার গ্রুপের পক্ষে কালুরঘাটে একটি কারখানা হাতবদল করা হয়েছে টপ স্কাই ফ্যাশন লিমিটেড নামে। কারখানা অধিগ্রহণ হলেও এখনো কোনো কাজ শুরু হয়নি। আমাদের প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কারখানাটির সার্বিক বিষয়ে দেখভাল করছে।’
কালুরঘাট বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মো. ছানা উল্লাহ বণিক বার্তাকে জানান, কালুরঘাট বিসিক শিল্পনগরী অনেক পুরনো ব্যবসায়িক কেন্দ্র। বর্তমানে প্রায় ২৪টি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ঋণসহ অন্যান্য জটিলতার কারণে বন্ধ আছে। সম্প্রতি চারটি রুগ্ণ প্রতিষ্ঠান হাতবদল হয়ে বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর হাতে যাচ্ছে। এ বৃহৎ শিল্প গ্রুপগুলোর হাত ধরেই বিসিকের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসছে। তাছাড়া যে প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ আছে, সেগুলোর বিষয়ে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান আমাদের কাছ থেকে খোঁজখবর নিচ্ছেন। কালুরঘাটের মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্পনগরীর প্লট খালী থাকা ব্যবসার জন্য ক্ষতিকারক। রুগ্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে ভালো প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে নতুনভাবে কাজ শুরু করে তার জন্য কাজ করছে বিসিক। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এ শিল্পনগরীতে কোনো বন্ধ প্রতিষ্ঠান থাকবে না।
কালুরঘাট বিসিকে বড় গ্রুপগুলোর বিনিয়োগ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীরা বলছেন, কালুরঘাটকে ঘিরে বড় ধরনের অবকাঠামোগত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। নগরীর অন্য জায়গার তুলনায় বিসিকের জমির দাম তুলনামূলক কম থাকায় বড় ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়ছে। তবে বিসিকের অভ্যন্তরে সড়ক ভাঙাচোরা এবং পানির কিছু সংকট থাকায় অনেক বিনিয়োগকারী সংশয়ে আছেন। বিষয়গুলো সমাধানের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সঙ্গে বসে কাজ করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে বিসিককেই।










