২০১৮ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো রেকর্ড স্বর্ণ ক্রয় করেছিল। সেই ধারা অব্যাহত ছিল বিদায়ী বছরেও। তবে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলো ধাতুটির ক্রয় কমিয়ে দেয়। গত বছরের শেষ মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ ক্রয় কমে পাঁচ মাসের সর্বনিম্নে নেমে গিয়েছিল। চলতি বছরের শুরুতে এ তুলনায় পণ্যটি ক্রয়ে চাঙ্গা ভাব ফিরেছে, যা ফেব্রুয়ারিতেও বজায় ছিল। তবে আগের মাসের তুলনায় বাড়লেও ফেব্রুয়ারিতে পণ্যটির ক্রয় আগের বছরের একই মাসের তুলনায় কমেছে অর্ধেকের বেশি। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের (ডব্লিউজিসি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। খবর মাইনিংডটকম।
ডব্লিউজিসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নিট স্বর্ণ ক্রয় কমে ৩৬ টনে নেমেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫২ শতাংশ কম। তবে এ বছরের জানুয়ারির তুলনায় তা প্রায় তিন গুণ বেশি।
এসব ব্যাংকের চলতি বছরের প্রথম দুই মাসের (জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি) সম্মিলিত নিট স্বর্ণ ক্রয় দাঁড়িয়েছে ৬৪ দশমিক ৫ টন, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৪৪ শতাংশ কম। ২০১৯ সালের প্রথম দুই মাসে ব্যাংকগুলোর নিট স্বর্ণ ক্রয়ের পরিমাণ ছিল ১১৬ দশমিক ১ টন। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে বিভিন্ন দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মূল্যবান ধাতুটির সম্মিলিত নিট ক্রয় ৫১ দশমিক ৬ টন কমেছে।
ডব্লিউজিসি জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মোট স্বর্ণ ক্রয় দাঁড়িয়েছে ৩৯ দশমিক ১ টন। আর বিক্রি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ১ টন। অর্থাৎ এ সময় পণ্যটির নিট ক্রয় দাঁড়িয়েছে ৩৬ টনে। এ হিসেবে বছরের প্রথম দুই মাসে বিক্রয়ের তুলনায় ব্যাংকগুলো ধাতুটির ক্রয় বেশি করেছে।
ফেব্রুয়ারি শেষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বর্ণ মজুদ নিয়ে প্রতিবেদন করেছে। এসব প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ ক্রয় করেছে তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেশটি ক্রয় করেছে নিট ২৪ দশমিক ৮ টন স্বর্ণ। ধাতুটির ক্রয়ের পরিমাণে এর পরের অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া। দেশটির ক্রয় করা নিট স্বর্ণের পরিমাণ ১০ দশমিক ৯ টন। এছাড়া অন্যান্য লক্ষণীয় ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে কাজাখস্তান ও কাতার। ফেব্রুয়ারিতে ১ দশমিক ৮ টন স্বর্ণ কিনেছে কাজাখস্তান। আর কাতার কিনেছে ১ দশমিক ৬ টন স্বর্ণ। এদিকে পণ্যটির একমাত্র উল্লেখযোগ্য বিক্রেতা হচ্ছে উজবেকিস্তান। দেশটি ফেব্রুয়ারিতে মোট ৩ দশমিক ১ টন স্বর্ণ বিক্রি করেছে।
এ বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সারা বিশ্বের মাত্র পাঁচটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কমপক্ষে এক টন হলেও স্বর্ণের মজুদ বাড়িয়েছে। ২০১৯ সালের একই সময়ে যার সংখ্যা ছিল আটটি। ধাতুটির মজুদ বাড়ানো পাঁচটি দেশ হচ্ছে তুরস্ক, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাজাখস্তান ও মঙ্গোলিয়া। বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত দেশগুলোর স্বর্ণ মজুদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৪১ টন, ১৯ টন, ৫ দশমিক ৯ টন, ২ দশমিক ৮ টন ও ১ টনে।
ডব্লিউজিসির মার্কেট ইন্টেলিজেন্স ম্যানেজার কৃষ্ণ গোপাল জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির স্বর্ণ ক্রয়ের চিত্র এটাই পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করে যে বিশ্বব্যাপী ধাতুটির চাহিদা রেকর্ড বৃদ্ধি সত্ত্বেও এটা এখনো গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চিতি হিসেবে মজুদ করা হয়। তবে বছরের বাকি সময়ের অবস্থা কী দাঁড়াবে তা এখনো অনিশ্চিত। তিনি অনেকটা সতর্ক করেই বলেন, বর্তমানে পণ্যটির বাজার যে অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাতে বছরের বাকি সময় ব্যাংকগুলো ক্রয় কমিয়ে দিতে পারে। গত কয়েক বছর ধরে স্বর্ণ ক্রয়ে শীর্ষ অবস্থানে থাকা রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি সপ্তাহের প্রথম দিকে ঘোষণা দিয়েছে, এ মাস থেকে প্রতিষ্ঠানটি আর স্বর্ণ কিনবে না।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে স্বর্ণের বাজারে টানা মন্দা ভাব বজায় রয়েছে। গত মাসে মূল্যবান ধাতুটির দাম কমে আউন্সপ্রতি ১ হাজার ৪৫০ ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল। তবে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান ধাতুটির দাম বেড়ে সাত বছরের সর্বোচ্চ ছুঁয়েছিল। ওই সময় প্রতি আউন্স স্বর্ণ ১ হাজার ৬০০ ডলারের রেকর্ড ছাড়িয়েছিল। নভেল করোনাভাইরাস প্রকোপে বিশ্বব্যাপী পণ্যটির খনিজ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া ও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক একের পর এক সুদহার কর্তন এর পেছনে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছিল। আর্থিক বাজারের এমন অস্থিরতা সেফ হ্যাভেন খ্যাত স্বর্ণের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ বাড়িয়ে তোলে। ফলে চাহিদা বেড়ে ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে পণ্যটির দাম।
যা-ই হোক সংস্থাটি প্রত্যাশা করছে, ২০২০ সালেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণের নিট ক্রেতাই থাকবে। অর্থাৎ বিক্রয়ের তুলনায় পণ্যটি ক্রয় করবে বেশি। তবে আগের দুই বছরের তুলনায় ক্রয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক পণ্যবাজারবিষয়ক বিশ্লেষক ম্যাথু টার্নারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণের নিট ক্রয় দাঁড়িয়েছিল ৫৩৭ টন, যা ছিল গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এদিকে ২০১৯ সালের প্রথম ১০ মাসেই (জানুয়ারি-অক্টোবর) এসব ব্যাংকের নিট স্বর্ণ ক্রয় আগের বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। ওই সময়ের মধ্যে ব্যাংকগুলো নিট ৫৫০ টন স্বর্ণ কিনেছিল।









